যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের স্যানফোর্ড ভূগর্ভস্থ গবেষণা কেন্দ্রে পরিচালিত পরীক্ষায় ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য কণার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের ২৫০ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী এই গবেষণায় অংশ নিয়েছেন। মাটির গভীরে থাকা একটি বিশাল ট্যাংকে অত্যন্ত বিশুদ্ধ তরল জেনন রাখা হয়েছে এবং ট্যাংকের চারপাশে শত শত আলোকসংবেদী যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে।
গবেষকরা ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২২০ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৩ সালের ১৬ জুন এমন একটি ঘটনার সন্ধান পান, যা তাদের প্রত্যাশিত সংকেতের সঙ্গে মিলে যায়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এমন একটি কাল্পনিক কণার সন্ধান করছিলেন, যাকে দুর্বলভাবে ক্রিয়াশীল ভারী কণা বলা হয়।
ধারণা করা হয়, এই কণা জেনন পরমাণুর কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে নির্দিষ্ট শক্তিতে দুই দফা আলোর ঝলক তৈরি হতে পারে।
গবেষণার মুখপাত্র রিক গেইটস্কেল সতর্ক করে বলেছেন, বিজ্ঞানীরা এখনো ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে পারেননি। তিনি জানান, পরীক্ষায় মাত্র একটি ব্যাখ্যাতীত কণার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, তাই বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।
গবেষণাটিতে অংশ নেওয়া সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ থেরেসা ফ্রুথ বলেন, এই ঘটনাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ কারণ গবেষকরা এটি বহুবার পরীক্ষা করেছেন এবং প্রতিবারই একই ফল পেয়েছেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, একটি মাত্র ঘটনার ভিত্তিতে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আরও তথ্য সংগ্রহ এবং একই ধরনের ঘটনা বারবার শনাক্ত করা প্রয়োজন।
ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার পদার্থকে মহাবিশ্বের অন্যতম বড় রহস্য হিসেবে ধরা হয়। বিজ্ঞানীরা এর অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন এর মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে। তবে এখন পর্যন্ত এটিকে সরাসরি দেখা বা শনাক্ত করা সম্ভব করা সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ২৭ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার।
এটি আলো প্রতিফলিত করে না এবং তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের সঙ্গেও সরাসরি মিথস্ক্রিয়া করে না, যার ফলে সাধারণ যন্ত্র দিয়ে এটি শনাক্ত করা কঠিন হয়।
অন্যদিকে, মহাবিশ্বের প্রায় ৬৮ শতাংশ ডার্ক এনার্জি বা অন্ধকার শক্তি দিয়ে গঠিত বলে ধারণা করা হয়। এই শক্তি মহাবিশ্বের প্রসারণকে আরও দ্রুত করে তোলে। আমরা যে সাধারণ পদার্থ দেখতে ও স্পর্শ করতে পারি, তা মহাবিশ্বের মোট অস্তিত্বের প্রায় ৫ শতাংশ মাত্র।
ডার্ক ম্যাটারের ধারণাটি প্রথম ১৯৩০-এর দশকে সুইস জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রিটজ জভিকি প্রদান করেন। তিনি কোমা ছায়াপুঞ্জের ছায়াপথগুলোর গতি পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে, দৃশ্যমান পদার্থের মহাকর্ষ দিয়ে ছায়াপথগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখা সম্ভব নয়। তিনি ধারণা করেন যে, সেখানে এমন কোনো অদৃশ্য পদার্থ রয়েছে যার মহাকর্ষ ছায়াপথগুলোকে ধরে রাখছে।
পরবর্তী কয়েক দশকে আরও গবেষণায় এই ধারণার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এখন পর্যন্ত এই পরীক্ষায় পাওয়া সংকেতগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এটি এমন একটি কণার সম্ভাব্য অস্তিত্বের ইঙ্গিত দিতে পারে যার ব্যাখ্যা বর্তমান পদার্থবিজ্ঞানের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে যদি একই ধরনের সংকেত বারবার পাওয়া যায় এবং এর অন্য কোনো সম্ভাব্য কারণ না থাকে, তবে এটি অন্ধকার পদার্থের অস্তিত্বের প্রথম শক্তিশালী প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে।
