সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো চাঞ্চল্যকর ভিডিও দেখার পর তা যাচাই না করেই শেয়ার করার প্রবণতা বাড়ছে। তবে ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো ঘটনার কি না, নাকি পুরোনো ফুটেজ, কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে বাস্তব এবং কৃত্রিম ভিডিওর মধ্যে পার্থক্য করা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। সম্প্রতি নেপালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওর সত্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। পরে দেখা যায়, অনেক ভিডিও ছিল পুরোনো বা অন্য দেশের ঘটনার, আবার কিছু ভিডিও এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল।
কোনো ভিডিও মিথ্যা হলেই সেটি এআই দিয়ে তৈরি এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক সময় আসল ভিডিও ভুল তথ্যের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। যেমন, কয়েক বছর আগের বন্যার দৃশ্যকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে প্রচার করা। অন্যদিকে, এআই-জেনারেটেড ভিডিও সম্পূর্ণ কৃত্রিম হতে পারে, যেখানে দেখানো ব্যক্তি বা স্থান বাস্তবে অস্তিত্বহীন।
তাই ভিডিও যাচাইয়ের সময় এর উৎস এবং প্রেক্ষাপট পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ভিডিও যাচাইয়ের প্রাথমিক ধাপ হলো সেটিকে খুঁটিয়ে দেখা। ভিডিওটি সন্দেহজনক মনে হলে বারবার চালিয়ে বিভিন্ন অংশ লক্ষ্য করতে হবে। মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, চোখের নড়াচড়া, হাত-পায়ের ভঙ্গি, কথা বলার সঙ্গে ঠোঁটের সামঞ্জস্য এবং আশপাশের পরিবেশের পরিবর্তন খেয়াল করা জরুরি।
এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওতে অনেক সময় হাতের আঙুল, মুখের গঠন, চুল, পোশাক কিংবা চলাফেরায় অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। কোনো বস্তুর আকার হঠাৎ বদলে যাওয়া বা পটভূমির অংশ বিকৃত হয়ে যাওয়াও এআই ব্যবহারের লক্ষণ হতে পারে। ভিডিওর ভেতরে থাকা ছোট ছোট তথ্য যেমন রাস্তার নাম, দোকানের সাইনবোর্ড, বিজ্ঞাপনের লেখা বা গাড়ির নম্বরপ্লেট ভালো করে দেখা উচিত।
এআই-জেনারেটেড কনটেন্টে লেখা অনেক সময় অস্পষ্ট বা ভুল বানানে থাকে। একই লেখার অংশ পরের ফ্রেমে ভিন্ন রকম দেখা যেতে পারে। ভিডিও যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো এর উৎস খুঁজে বের করা। ভিডিও থেকে একটি পরিষ্কার ফ্রেমের স্ক্রিনশট নিয়ে গুগল লেন্স বা রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে দেখা সম্ভব যে, একই ফুটেজ আগে কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল কি না।
যদি দেখা যায় একই ফুটেজ কয়েক বছর আগে অন্য কোনো ঘটনার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছিল, তবে বর্তমান দাবিটি নিয়ে সন্দেহ করা যৌক্তিক। এছাড়া বড় কোনো ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হলে সেটির সত্যতা নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্যাপশনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
সন্দেহ দূর করতে কিছু এআই ডিটেকশন টুল ব্যবহার করা যেতে পারে। রিয়েলিটি ডিফেন্ডার, হাইভ মডারেশন, ডিপওয়্যার স্ক্যানার এবং গুগল জেমিনির মতো টুলগুলো ছবি, ভিডিও ও অডিও বিশ্লেষণ করে এআই-জেনারেটেড বা ডিপফেকের সম্ভাবনা শনাক্ত করতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে, কোনো টুলের ফলাফলই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
কোনো টুল যদি ভিডিওটিকে ‘সম্ভবত এআই’ বলে চিহ্নিত করে, তবে সেটিকে নিশ্চিতভাবে ভুয়া বলা যাবে না। আবার কোনো টুলে এআই শনাক্ত না হলেও ভিডিওটি যে শতভাগ সত্য, তা-ও নিশ্চিত নয়। তাই প্রযুক্তিগত পরীক্ষার পাশাপাশি উৎস, সময়, স্থান এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট মিলিয়ে দেখা জরুরি। কোনো ভাইরাল ভিডিও দেখার পর শেয়ার করার আগে অন্তত ৩০ সেকেন্ড সময় নিয়ে এর সত্যতা যাচাই করার অভ্যাস করা উচিত।
ভুল তথ্য ছড়ানো রোধে ‘আগে যাচাই, পরে শেয়ার’—এই নীতি অনুসরণ করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুল ভিডিও কয়েক মিনিটেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাই সচেতনতা এবং সঠিক যাচাই পদ্ধতি অনুসরণ করাই বর্তমান সময়ের দাবি।
