ইন্টারনেটে কোনো তথ্য খোঁজার জন্য সার্চ ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধীরা নতুন ধরনের প্রতারণা শুরু করেছে। সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় এই কৌশলকে বলা হয় এসইও পয়জনিং বা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন পয়জনিং। এই প্রক্রিয়ায় প্রতারকরা ভুয়া ওয়েবসাইট বা লিঙ্কগুলোকে সার্চ ফলাফলের একেবারে উপরের দিকে নিয়ে আসে, যা দেখতে হুবহু আসল ওয়েবসাইটের মতো মনে হয়।
অসতর্ক ব্যবহারকারীরা এই লিঙ্কগুলোতে ক্লিক করলে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংকিং তথ্য এমনকি বিপুল পরিমাণ অর্থ খোয়ানোর ঝুঁকিতে পড়েন। এসইও বা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন মূলত একটি বৈধ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে ওয়েবসাইটগুলো সার্চ ফলাফলে নিজেদের দৃশ্যমানতা বাড়ায়। প্রতারকরা সেই একই কৌশল ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কীওয়ার্ডকে লক্ষ্যবস্তু করে।
মানুষ কোন এলাকায় বসে কী ধরনের পরিষেবা খুঁজছে, তা বিশ্লেষণ করে তারা ভুয়া ওয়েবসাইট, কাস্টমার কেয়ার নম্বর কিংবা ডাউনলোড লিঙ্ক তৈরি করে। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারী সার্চ করে প্রথম দিকের লিঙ্কে ক্লিক করলেই প্রতারকদের তৈরি ফাঁদে পা দেন। এই ধরনের প্রতারণার একটি উদাহরণ পাওয়া গেছে ভারতের হায়দরাবাদে।
প্রেরণা নামে এক নারী গাড়ি ভাড়া করার উপায় খুঁজতে গিয়ে সার্চ ইঞ্জিনে ‘গণেশ কার ট্রাভেলস’ নামে একটি ওয়েবসাইটের সন্ধান পান। ওয়েবসাইটটি দেখে তার কাছে আসল মনে হয়েছিল। লিঙ্কে প্রবেশের পর রোহিত নামে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করে নিজেকে কাস্টমার কেয়ার কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি প্রেরণাকে গাড়ি বুক করার জন্য একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলেন।
অ্যাপটি ডাউনলোড করার পর প্রেরণার কাছ থেকে গাড়ি ভাড়ার তথ্য নেওয়া হয় এবং ছোট অঙ্কের টাকা অনলাইনে লেনদেন করতে বলা হয়। টাকা পাঠানোর পরপরই প্রেরণার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে একের পর এক টাকা কাটতে শুরু করে এবং ওটিপি আসা বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২ লাখ টাকা হারান।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই প্রতারণাকে আরও নিখুঁত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের সার্চ প্রবণতা বিশ্লেষণ করে প্রতারকরা তাদের কনটেন্ট তৈরি করছে। শুধু টাকা হাতিয়ে নেওয়াই নয়, এই ভুয়া ওয়েবসাইটগুলো ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য চুরি করতে বা ডিভাইসে ম্যালওয়্যার ছড়াতেও ব্যবহৃত হতে পারে।
এসইও পয়জনিংয়ের ঝুঁকি কেবল আর্থিক লেনদেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়াতেও এমন একটি ঘটনা দেখা গিয়েছিল, যেখানে ‘আর বেঙ্গল ক্যাটস লিগাল ইন অস্ট্রেলিয়া’ জাতীয় সার্চ প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া লিঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা সার্চ করার সময় ব্যবহারকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কোনো লিঙ্কে ঢোকার পর যদি টাকা পাঠাতে, ওটিপি দিতে, অচেনা অ্যাপ ইনস্টল করতে বা ব্যক্তিগত তথ্য জানাতে বলা হয়, তবে তা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
ওয়েবসাইটের ঠিকানা বা ইউআরএল ভালো করে যাচাই করা, সরাসরি অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা এবং কাস্টমার কেয়ার নম্বর যাচাই করা জরুরি। এছাড়া ব্রাউজারে সেফ ব্রাউজিং সুবিধা চালু রাখা এবং ডিভাইসে নিয়মিত আপডেট হওয়া অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করা সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। সার্চ ফলাফলের প্রথম লিঙ্ক মানেই নিরাপদ নয়, তাই ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার সময় ‘কী পেলাম’ তার চেয়ে ‘কোথা থেকে পেলাম’ সেটি যাচাই করা এখন সময়ের দাবি।
