লোডশেডিংয়ের সময় বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ কমছে না, যা গ্রাহকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকার সময় কম হলেও বাকি সময়ে ফ্রিজ, এসি, পানির পাম্প, গিজার, টিভি ও কম্পিউটারের মতো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মোট বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যেতে পারে।
এছাড়া মিটারের যান্ত্রিক ত্রুটি, ভুল রিডিং কিংবা বাড়ির অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক লাইনে কোনো লিকেজ বা ত্রুটি থাকলেও অস্বাভাবিক বিল আসার সম্ভাবনা থাকে। তাই বিদ্যুৎ বিল বেশি এলে আতঙ্কিত না হয়ে কয়েকটি বিষয় যাচাই করে নেওয়া জরুরি। প্রথমেই চলতি মাসের বিলের সঙ্গে আগের কয়েক মাসের বিলের তুলনা করা প্রয়োজন।
শুধু টাকার অঙ্ক নয়, কত ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে। অনেক সময় বিদ্যুতের ব্যবহারের পরিমাণ একই থাকলেও অন্যান্য চার্জের কারণে বিলের অঙ্কে পার্থক্য হতে পারে। তাই বিলের বিস্তারিত হিসাব দেখা জরুরি। বিদ্যুৎ বিল হাতে পাওয়ার পর বিলে উল্লেখ করা মিটার রিডিং এবং মিটারে থাকা বর্তমান রিডিং মিলিয়ে দেখা উচিত।
রিডিংয়ে বড় ধরনের অসঙ্গতি থাকলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে অনুমানভিত্তিক রিডিংয়ের কারণে কোনো মাসে কম বা বেশি বিল দেখানো হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে সেটির সমন্বয় হতে পারে। তাই শুধু একটি মাসের বিল দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কয়েক মাসের হিসাব পাশাপাশি রাখা ভালো।
লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ খরচ কম হওয়ার কথা মনে হলেও, বিদ্যুৎ থাকা সময়টুকুতে যদি উচ্চ ক্ষমতার যন্ত্র দীর্ঘক্ষণ চলে, তাহলে মোট ইউনিট খরচ কম নাও হতে পারে। গরমের সময়ে এসি বিদ্যুৎ খরচের অন্যতম প্রধান কারণ। তাপমাত্রা খুব কমিয়ে দিয়ে দীর্ঘক্ষণ এসি চালালে বিদ্যুৎ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।
ফ্রিজ ২৪ ঘণ্টাই সচল থাকে, তাই দরজা বারবার খোলা, অতিরিক্ত বরফ জমা, দরজার রাবার নষ্ট হওয়া বা যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিদ্যুৎ খরচ বেড়ে যেতে পারে। পানির পাম্প প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় চালানো হলে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচ হয়। পাম্পে যান্ত্রিক সমস্যা থাকলেও একই কাজ করতে বেশি বিদ্যুৎ লাগতে পারে।
গিজার, হিটার, ইস্ত্রি, রাইস কুকার ও ইলেকট্রিক কেটলির মতো উচ্চ ক্ষমতার যন্ত্রগুলো নিয়মিত ব্যবহার করলে ইউনিট বাড়তে পারে। স্ট্যান্ডবাই মোডও বিদ্যুৎ খরচের একটি কারণ। টিভি, কম্পিউটার, মনিটর বা চার্জার ব্যবহার শেষে শুধু রিমোট দিয়ে বন্ধ করে রাখলে অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো পুরোপুরি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে না।
প্রতিটি ডিভাইসের স্ট্যান্ডবাই খরচ আলাদা এবং সাধারণত খুব বেশি নয়, তবে অনেক ডিভাইস দীর্ঘসময় এভাবে সংযুক্ত থাকলে সামান্য খরচ যোগ হতে পারে। তাই ব্যবহার না করলে সম্ভব হলে সুইচ বা পাওয়ার স্ট্রিপ বন্ধ করে দেওয়া ভালো। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ফিরে এলে একসঙ্গে অনেক ভারী যন্ত্র চালু করার প্রবণতা থাকে।
এতে একসঙ্গে বেশি লোড তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ফ্রিজ, এসি, পাম্প, গিজার বা হিটারের মতো যন্ত্র একসঙ্গে চালু না করে কিছুটা ব্যবধান রাখা ভালো। এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সহজ হয় এবং বৈদ্যুতিক লাইনের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়ানো যায়। বাড়ির সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ করার পরও যদি মিটার অস্বাভাবিকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সংকেত দেয়, তবে বিষয়টি পরীক্ষা করা দরকার।
তবে নিজে মিটার খুলবেন না বা বৈদ্যুতিক সংযোগে হাত দেবেন না। সব যন্ত্র বন্ধ করার পরও মিটারে খরচের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে বৈদ্যুতিক লাইনে ত্রুটি বা লিকেজ থাকতে পারে। এক্ষেত্রে দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে পরীক্ষা করানো নিরাপদ। যদি কয়েক মাসের ব্যবহারের সঙ্গে বর্তমান বিলের কোনো মিল না থাকে, মিটার রিডিং ভুল মনে হয় বা মিটার নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে অভিযোগ করা উচিত।
অভিযোগ করার সময় আগের কয়েক মাসের বিল, বর্তমান মিটার রিডিং এবং অস্বাভাবিক বিলের তথ্য হাতে রাখলে বিষয়টি বোঝানো সহজ হয়। বারবার লোডশেডিং হলেও বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার অর্থ এই নয় যে বিলটি অবশ্যই ভুল। বিদ্যুৎ থাকার সময় কোন কোন যন্ত্র কতক্ষণ চলছে, সেটিই মোট ব্যবহারের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই বিল বেশি এলে প্রথমে ইউনিট খরচ, মিটার রিডিং ও উচ্চ ক্ষমতার যন্ত্রগুলোর ব্যবহার যাচাই করুন। এরপরও কারণ না মিললে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ানের সাহায্য নিন। এতে অযথা বেশি বিল দেওয়ার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব।
