স্মার্টফোন বর্তমানে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পড়াশোনা ও বিনোদনের প্রয়োজনে শিশুরা নিয়মিত স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। তবে ইন্টারনেটে শিক্ষামূলক কনটেন্টের পাশাপাশি বয়সের অনুপযুক্ত ভিডিও, ছবি ও ওয়েবসাইট থাকার ঝুঁকি রয়েছে। কৌতূহলবশত বা ভুলবশত শিশুরা এসব ক্ষতিকর কনটেন্টের সম্মুখীন হতে পারে। তাই শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সচেতনতা এবং ফোনের নিজস্ব নিরাপত্তা সেটিংস ব্যবহার করা জরুরি।
আইফোন এবং অ্যান্ড্রয়েড উভয় ডিভাইসেই শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। আইফোন ব্যবহারকারীদের জন্য স্ক্রিন টাইম ফিচারটি অত্যন্ত কার্যকর। এই ফিচারটি চালু করতে সেটিংস থেকে স্ক্রিন টাইম অপশনে যেতে হবে। এরপর কনটেন্ট অ্যান্ড প্রাইভেসি রেস্ট্রিকশনস অপশনটি চালু করে একটি আলাদা পাসকোড সেট করতে হবে।
এই পাসকোডটি সন্তানের কাছ থেকে গোপন রাখা প্রয়োজন। এরপর ওয়েব কনটেন্ট অপশনে গিয়ে লিমিট অ্যাডাল্ট ওয়েবসাইটস নির্বাচন করলে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি ওয়েবসাইটগুলোতে প্রবেশ সীমিত করা সম্ভব। এছাড়া অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী সীমা নির্ধারণ করা যায়। আইটিউনস ও অ্যাপ স্টোর পারচেজে বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে সন্তানের অনুমতি ছাড়া নতুন অ্যাপ ডাউনলোড বা ইন-অ্যাপ কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
স্ক্রিন টাইমের মাধ্যমে প্রতিদিন নির্দিষ্ট অ্যাপ বা ফোনের ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা যায়, যা রাতে ঘুমের সময় ফোন ব্যবহার রোধে সহায়তা করে। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ক্ষেত্রে গুগল ফ্যামিলি লিঙ্ক একটি কার্যকর মাধ্যম। বাবা-মায়ের ফোনে ফ্যামিলি লিঙ্ক সেটআপ করে সন্তানের ডিভাইসের সঙ্গে সংযুক্ত করলে তার অ্যাপ ব্যবহার ও স্ক্রিন টাইমের ওপর নজর রাখা যায়।
এর মাধ্যমে কোন অ্যাপ ব্যবহার করা যাবে, কোন অ্যাপ ব্লক থাকবে এবং প্রতিদিন কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করা যাবে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব। এছাড়া সন্তানের ডিভাইসের লোকেশন দেখার সুবিধাও এতে রয়েছে। ফ্যামিলি লিঙ্ক ব্যবহার করতে না চাইলে অ্যান্ড্রয়েডের ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং ফিচার ব্যবহার করা যেতে পারে। সেখানে ফোকাস মোড ও অ্যাপ টাইমার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট অ্যাপের ব্যবহার সীমিত করা যায়।
গুগল প্লে স্টোরের প্যারেন্টাল কন্ট্রোলস চালু করে বয়স অনুযায়ী অ্যাপ ও কনটেন্ট ফিল্টার করা সম্ভব। গুগল সার্চে সেফসার্চ চালু রাখলে অনুপযুক্ত সার্চ রেজাল্ট আসার সম্ভাবনা কমে যায়। শুধু ফোনের সেটিংস পরিবর্তন করলেই হবে না, ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। ইউটিউবে রেস্ট্রিকটেড মোড বা শিশুদের জন্য থাকা অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখা উচিত।
সন্তানের ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের প্রাইভেসি সেটিংস নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অ্যাকাউন্ট প্রাইভেট রাখা, অপরিচিত ব্যক্তির যোগাযোগ সীমিত করা এবং সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট ব্লক বা রিপোর্ট করার নিয়ম শিশুকে শেখানো জরুরি। প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অনুপযুক্ত কনটেন্ট চোখে পড়লে বকাঝকা না করে কেন সেটি তার বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়, তা বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন।
এতে অনলাইনে কোনো সমস্যায় পড়লে সন্তান বিষয়টি বাবা-মায়ের কাছে সহজে জানাতে পারবে। রাতে ফোন সন্তানের বিছানার পাশে না রেখে নির্দিষ্ট জায়গায় চার্জে দেওয়ার অভ্যাস করা এবং পরিবারের মধ্যে প্রতিদিন কিছু সময় ফোন-মুক্ত রাখা ভালো। শিশুকে ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা সম্ভব নয় এবং তা প্রয়োজনীয়ও নয়।
লক্ষ্য হওয়া উচিত ফোন বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং নিরাপদভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো। অ্যাডাল্ট কনটেন্টের পাশাপাশি সাইবার বুলিং, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ঝুঁকি সম্পর্কেও শিশুকে সচেতন করতে হবে। প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নজরদারি এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক বজায় রাখলে অনলাইন ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
