জাপানের ইয়ামাগাতা অঞ্চলের ধানখেতে আগাছা দমনের জন্য স্বয়ংক্রিয় রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। নিউগ্রিন নামক প্রতিষ্ঠানের তৈরি এই যন্ত্রটি ‘আইগামো রোবো’ নামে পরিচিত। জাপানের ঐতিহ্যবাহী আইগামো চাষ পদ্ধতির আদলে এই রোবটটি তৈরি করা হয়েছে। প্রথাগত পদ্ধতিতে হাঁস ব্যবহার করে ধানখেতের আগাছা ও ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
তবে হাঁস পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ শ্রমসাধ্য হওয়ায় এর বিকল্প হিসেবে প্রকৌশলীরা এই রোবট উদ্ভাবন করেছেন। রোবটটি ধানখেতে পানির ওপর ভেসে থেকে কাজ করে। এটি সৌরশক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো খেত চষে বেড়ায়। রোবটটির নিচে ঘূর্ণমান ব্রাশ রয়েছে, যা পানি ও মাটি আলোড়িত করে।
এই প্রক্রিয়ায় পানির ঘোলাটে ভাব সূর্যালোককে মাটিতে পৌঁছাতে বাধা দেয়, ফলে আগাছার অঙ্কুরোদ্গম ও বৃদ্ধি কমে যায়। এছাড়া রোবটের কম্পন ক্ষতিকর শামুক দমনেও সহায়তা করে। নিসান জাপানের প্রকৌশলী তেৎসুইয়া নাকামুরা এই রোবটটি উদ্ভাবন করেছেন। তিনি জানান, রোবটটি ধানগাছের কোনো ক্ষতি করে না, বরং আলতো ধাক্কার মাধ্যমে গাছের মূলকে আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করে।
এই রোবট ব্যবহারের ফলে আগাছা পরিষ্কারের শ্রম প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে এবং ফসলের ফলন প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রোবটটির দ্বিতীয় সংস্করণ বাজারে রয়েছে, যার ওজন মাত্র ৬ কেজি। এটি প্রায় ১ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে কাজ করতে সক্ষম। স্মার্টফোনের মাধ্যমে রোবটটির গতিপথ ও ব্যাটারির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়।
জাপানের ইনুউয়ে ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকাতোশি ইনুউয়ে জানান, জৈব পদ্ধতিতে ধান চাষে শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে এই রোবট কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তিনি তার কয়েক হেক্টর জমিতে তিনটি রোবট ব্যবহার করছেন। জাপানের টেকসই কৃষিসংক্রান্ত ‘মিদোরি’ কৌশলের আওতায় ২০৫০ সালের মধ্যে মোট কৃষিজমির ২৫ শতাংশ জৈব চাষের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই লক্ষ্য অর্জনে আইগামো রোবোর মতো প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে জাপানে কয়েক হাজার রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশেও এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। কৃষিপ্রধান দেশগুলোতে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ধান উৎপাদন ও শ্রম সংকট নিরসনে এই রোবট একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
উদ্ভাবক তেৎসুইয়া নাকামুরা বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি চালুর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। রাসায়নিক কীটনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করাই এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য। রোবটটি ব্যবহারের ফলে মিথেন নিঃসরণ হ্রাসেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে, কারণ এটি মাটির মিথেন উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। জাপানের কৃষি খাতে বয়স্ক শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং কর্মিসংকট দেখা দেওয়ায় এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি কৃষকদের জন্য সহায়ক হয়ে উঠেছে।
রোবটটির দাম প্রায় আড়াই লাখ ইয়েন নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ছোট ও মাঝারি খামারের জন্য সাশ্রয়ী। এটি পরিচালনা করা সহজ হওয়ায় বয়স্ক কৃষকরাও এটি ব্যবহার করতে পারছেন। জাপানের কৃষি ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির এই সংযোজন টেকসই কৃষির পথে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
