আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন লিওনেল মেসি। দীর্ঘ ২১ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে তিনি জানিয়েছেন, তার পক্ষে আর নতুন করে কিছু দেওয়া সম্ভব নয়। এই ঘোষণার পর আর্জেন্টিনা জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দেশটির সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গণমাধ্যম পর্যন্ত সবাই তাদের প্রিয় তারকার বিদায়কে এক গভীর আবেগের সাথে গ্রহণ করেছে।
মেসি জাতীয় দলের হয়ে মোট ২০৭টি ম্যাচ খেলেছেন, যা একটি ফুটবলীয় জীবনের সমতুল্য। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ১২৫টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে ৬৮টি গোল করিয়েছেন। তিনি মোট ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছেন এবং ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। এছাড়া তিনি আরও দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছেন।
তার ক্যারিয়ারের শেষ উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনী ছিল আটলান্টায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচ, যেখানে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয়লাভ করে। এই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে একটি স্মরণীয় বিজয় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে চার দিন পর অনুষ্ঠিত ফাইনালে স্পেন দলের কাছে ১-০ ব্যবধানে পরাজিত হয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে মেসি তার বাবাকে লেখা এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে, তার পা আর সঙ্গ দিচ্ছে না।
এই পরাজয়ের পর মাঠের পরিস্থিতি এবং খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা সমালোচনা হলেও, মেসির কাছে এটি ছিল এক নিঃশব্দ বিদায়ের সুর। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ সময় বড় কোনো শিরোপা না পাওয়ায় মেসিকে অতীতে অনেক কটূক্তি সহ্য করতে হয়েছে। ২০১৬ সালে একবার তিনি দল ছাড়ার ঘোষণা দিলেও পরে ফিরে আসেন।
তার এই ধৈর্য ও অধ্যবসায় তাকে আর্জেন্টিনার জাতীয় প্রতীকে পরিণত করেছে। মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনায় দাবি উঠেছে যে, তার সম্মানে ১০ নম্বর জার্সিটি চিরতরে অবসর দেওয়া হোক। তবে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) জানিয়েছে, ফিফার নিয়ম অনুযায়ী প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে জার্সি নম্বর তুলে রাখা সম্ভব নয়। এর আগে ২০২০ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর পরও একই ধরনের দাবি উঠেছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে ১০ নম্বর জার্সিটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি সৃজনশীলতা ও জাদুকরী প্রতিভার প্রতীক। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনা এই জার্সিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে মেসি নিজের ক্যারিয়ারে আরও বিস্তৃত করেছেন। ম্যারাডোনা ও মেসি দুজনেই আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে একটি করে ট্রফি জিতেছেন এবং দলকে একাধিক ফাইনালে তুলেছেন।
তবে তাদের ব্যক্তিত্ব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ম্যারাডোনা ছিলেন আবেগপ্রবণ ও উচ্ছ্বসিত, অন্যদিকে মেসি বরাবরই আত্মসংযমী ও শান্ত। মেসি ম্যারাডোনার ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজের নিজস্ব শৈলীতে এই জার্সি ও দলের দায়িত্ব বহন করেছেন। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস প্রমাণ করে যে, দেশটি নিয়মিত নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করে আসছে।
১০ নম্বর জার্সিটি অবসরে পাঠানোর অর্থ হলো নতুন কোনো খেলোয়াড়ের আগমনের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এখনই সেই আশা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়। মেসির বিদায়ের মাধ্যমে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটলেও, আর্জেন্টিনার ফুটবলের ঐতিহ্য ও নতুন কিংবদন্তি তৈরির প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেসির এই প্রস্থান আর্জেন্টিনার ফুটবল ভক্তদের জন্য এক অভিভাবকহীনতার দিন হলেও, ভবিষ্যতের নতুন কোনো রূপকথার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো দেশ।
