আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে দীর্ঘ দুই দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন লিওনেল মেসি। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে পরাজিত হওয়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি হাতে লেখা নোটের ছবি পোস্ট করে মেসি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
তিনি উল্লেখ করেন যে, ফাইনাল ম্যাচের দুই দিন পরই তিনি এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এছাড়া চলতি বছরের ৮ আগস্ট তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, যা তার অবসরের সিদ্ধান্তকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ২০০৫ সালে অভিষেক হওয়ার পর থেকে মেসি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন।
তার এই দীর্ঘ যাত্রায় অসংখ্য উত্থান-পতন ও স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। সেই হতাশাজনক শুরুর পর ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গোল করে তিনি নিজের জাত চিনিয়েছিলেন।
২০১০ সালের বিশ্বকাপে কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে খেলা ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বিশেষ অধ্যায়। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও জার্মানির কাছে পরাজিত হয়, তবে মেসি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল অর্জন করেন। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর মেসি প্রথমবার অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তবে পরবর্তীতে তিনি দলে ফিরে আসেন।
২০২১ সালে ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে তিনি আর্জেন্টিনার দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটান। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে তার গোলটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা আর্জেন্টিনার ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। একই বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় এবং মেসি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সেও তিনি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করার মাধ্যমে তিনি ১৮ গোল নিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে পুরুষদের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছিলেন, যা পরবর্তীতে কিলিয়ান এমবাপে অতিক্রম করেন। একই আসরের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে মেসি দুটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন।
তবে ২০২৬ সালের ফাইনাল ম্যাচটিই ছিল তার জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচ। স্পেনের কাছে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটল। মেসি তার ক্যারিয়ারে অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছেন এবং অসংখ্যবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে তার ফিরে আসার মানসিকতা ও অদম্য জেদ তাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আর্জেন্টিনার কোটি কোটি সমর্থকের কাছে তিনি কেবল একজন ফুটবলার নন, বরং একটি আবেগের নাম হয়ে উঠেছিলেন। তার অবসরের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার ফুটবলে একটি যুগের অবসান ঘটল।
