বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তার কর্মজীবন ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে নানা স্মৃতিচারণ করছেন তার সহকর্মীরা। এই বিশেষ দিনে প্রখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ করার একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘রক্ততিলক’ সিনেমায় উত্তম কুমার একজন পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
এই সিনেমার একটি দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল চলন্ত ট্রেনে। দৃশ্যটিতে উত্তম কুমারের চরিত্রটি ঘুমিয়ে থাকার কথা ছিল এবং ডাকাতের ভূমিকায় থাকা বিশ্বজিৎ তার দলবল নিয়ে তাকে হত্যার জন্য উপস্থিত হবেন। শুটিংয়ের সময় চলন্ত ট্রেনে আলোর প্রতিফলনের কারণে ক্যামেরার ক্লোজআপ শটে উত্তম কুমারের মুখ সঠিকভাবে ফুটে উঠছিল না।
বারবার চেষ্টা করার পরও কাঙ্ক্ষিত শট পাওয়া যাচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় নিজেই উত্তম কুমারের ঘাড় ধরে তাকে ক্যামেরার সামনে সঠিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেন। সেটে উপস্থিত অন্য কলাকুশলীরা একজন বড় তারকার সঙ্গে এমন আচরণ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তবে উত্তম কুমার এই ঘটনায় বিন্দুমাত্র বিরক্ত হননি বা কোনো প্রতিবাদ করেননি।
বরং দৃশ্যটি সফলভাবে ধারণ করার পর বিশ্বজিৎ যখন তার আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন, তখন উত্তম কুমার তাকে আশ্বস্ত করেন। তিনি জানান, বিশ্বজিৎ সঠিক কাজটিই করেছেন এবং তার নির্দেশনার কারণেই শটটি নিখুঁত হয়েছে। সেটে উপস্থিত অন্য পরিচালকরা যখন উত্তম কুমারকে এই ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন তিনি জানান যে বিশ্বজিৎ কাজের কৌশল জানেন এবং কীভাবে সেরা অভিনয় বের করে নিতে হয় তা তার জানা আছে।
উত্তম কুমারের এই বিনয় ও পেশাদারিত্ব তার সহকর্মীদের কাছে তাকে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছিল। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা উত্তম কুমারের আসল নাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। তার দীর্ঘ চলচ্চিত্র জীবনে তিনি দুই শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি পরিচালক, প্রযোজক ও সুরকার হিসেবেও কাজ করেছেন।
উত্তম কুমারের ক্যারিয়ারে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তার জুটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘সাগরিকা’ ও ‘চাওয়া-পাওয়া’সহ প্রায় ৩০টি সিনেমায় তারা একসঙ্গে অভিনয় করেছেন। নিজের সাফল্যের পেছনে সুচিত্রা সেনের অবদানকে উত্তম কুমার সবসময় স্বীকার করতেন। তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন যে, সুচিত্রা সেন পাশে না থাকলে তিনি হয়তো আজকের উত্তম কুমার হয়ে উঠতে পারতেন না।
মাত্র ৫৩ বছর বয়সে ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তম কুমার মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর ৪৬ বছর পরও তার জনপ্রিয়তা ও প্রভাব বাংলা চলচ্চিত্রে অটুট রয়েছে। জন্মশতবর্ষে তাকে ঘিরে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনা ও স্মৃতিচারণ প্রমাণ করে যে, তিনি আজও দর্শকদের হৃদয়ে এক অমলিন আবেগ হয়ে বেঁচে আছেন।
তার অভিনয় দক্ষতা এবং সহকর্মীদের প্রতি তার বিনয়ী আচরণ আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। উত্তম কুমারের এই পেশাদারিত্বের গল্পটি তার কর্মজীবনের প্রতি তার গভীর নিষ্ঠারই পরিচয় বহন করে।
