বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ আবারও ১৩টি দল নিয়ে মাঠে গড়ানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ২০২০-২১ মৌসুমের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে দেশের পেশাদার ফুটবলে পুনরায় ১৩ দলের লিগ ফিরছে। সবকিছু পরিকল্পনামতো সম্পন্ন হলে এটি হবে বাংলাদেশের পেশাদার ফুটবলের ইতিহাসে পঞ্চমবারের মতো ১৩ দল নিয়ে শীর্ষ লিগ আয়োজন।
২০০৭ সালে ‘বি লিগ’ নামে যাত্রা শুরুর মাধ্যমে বাংলাদেশে পেশাদার ফুটবল লিগের সূচনা হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশের ঘরোয়া ফুটবলে অপেশাদার যুগের অবসান ঘটে এবং পেশাদার কাঠামোর নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তবে দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই পেশাদার কাঠামো এখনো স্থায়ী রূপ পায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লিগের দলসংখ্যা, নাম এবং স্টেডিয়ামের ক্ষেত্রে কোনো স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যায়নি। প্রতি বছরই নতুন দলের অন্তর্ভুক্তি এবং মাঠ পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়। গত ২০ বছরে পেশাদার ফুটবল লিগে ২৭টি দলের অভিষেক হয়েছে এবং এবার আরও দুটি নতুন দল যুক্ত হতে যাচ্ছে। তবে হাতে গোনা কয়েকটি ক্লাব ছাড়া বাকি দলগুলোর অংশগ্রহণ অনিয়মিত।
বসুন্ধরা কিংস ছাড়া আর কোনো ক্লাবের নিজস্ব মাঠ নেই, অথচ পেশাদার লিগের অন্যতম প্রধান শর্তই হচ্ছে ক্লাবের নিজস্ব ভেন্যু থাকা। এমনকি মোহামেডান ও আবাহনীর মতো জনপ্রিয় ক্লাবগুলোকেও হোম ভেন্যু হিসেবে অন্য মাঠ ব্যবহার করতে হয়। ২০০৯-১০ মৌসুমে প্রথমবারের মতো ১৩ দল নিয়ে লিগ অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর বিভিন্ন সময়ে ক্লাবের অবনমন, নতুন দলের উত্তরণ এবং লিগের কাঠামো পরিবর্তনের কারণে দলসংখ্যায় বারবার পরিবর্তন এসেছে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে আবারও ১৩ দল নিয়ে লিগ শুরু হয়। ২০১৯-২০ মৌসুমেও ১৩ দল নিয়ে লিগ শুরু হলেও করোনাভাইরাস মহামারির কারণে তা মাঝপথে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। সাবেক তারকা ফুটবলার ও কোচ সফিকুল ইসলাম মানিক মনে করেন, হুটহাট সিদ্ধান্তে দল বাড়ানো পেশাদার কাঠামোর জন্য ইতিবাচক নয়।
তিনি বিশেষ করে শীর্ষ লিগ থেকে অবনমিত হওয়া দলগুলোকে পুনরায় খেলার সুযোগ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, বাফুফের উচিত ক্লাবগুলোকে পেশাদারিত্বের দিকে ধাবিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখা। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ দেড় যুগের বেশি সময় পার হলেও লিগ কোনো শক্ত কাঠামোয় দাঁড়াতে পারেনি।
বর্তমানে বিদেশি ফুটবলারদের আধিক্য থাকলেও দেশীয় খেলোয়াড় তৈরির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। দলসংখ্যা বাড়ায় ম্যাচের সংখ্যা ও ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পাবে এবং আরও বেশি ফুটবলার খেলার সুযোগ পাবেন। তবে বড় পরিসরের এই লিগ সফল করতে ক্লাবগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত মান ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।
এবার লিগের দলসংখ্যা ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৩ করার পেছনে ফিফার খেলোয়াড় নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞাজনিত বিশেষ পরিস্থিতি কাজ করেছে। আবাহনী, বসুন্ধরা কিংস ও ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় দল গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বাফুফে অবনমিত আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবকে লিগে বহাল রাখে এবং ঢাকা ওয়ান্ডারার্সকে খেলার অনুমতি দেয়।
মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক মোস্তাকুর রহমান এই সিদ্ধান্তকে বাফুফের আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, লিগের মান বৃদ্ধির চেয়ে বাফুফে মূলত লিগ আয়োজন নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অভিজ্ঞ ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক ফুটবলার জাহিদ হাসান এমিলি এই লিগের মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তিনি মনে করেন, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দল বাড়ালে খেলার সংখ্যা বাড়লেও মান বাড়বে না। দীর্ঘ ২০ বছরেও পেশাদার লিগ কোনো কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে না পারায় তিনি হতাশা ব্যক্ত করেন। তার মতে, অবনমিত দলগুলোকে পুনরায় সুযোগ দিলে অন্য ক্লাবগুলোও নিয়ম মানার ক্ষেত্রে উদাসীন হয়ে পড়বে।
লিগ শক্তিশালী করতে হলে মানসম্মত খেলোয়াড় ও শক্তিশালী ক্লাবের উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
