বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের গাড়ির প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়, যিনি পরবর্তীতে উত্তম কুমার নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান, তার তারকাখ্যাতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত গ্যারেজে যুক্ত করেছিলেন একের পর এক বিলাসবহুল গাড়ি। তার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বর্তমানে তার বর্ণাঢ্য জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো তার এই গাড়িপ্রীতি।
উত্তম কুমারের ঘনিষ্ঠজন এবং পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, তিনি নতুন মডেলের গাড়ির খবরাখবর রাখতেন এবং শুটিংয়ের ব্যস্ততার মাঝেও গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পছন্দ করতেন। তার গ্যারেজে বিভিন্ন সময়ে মরিস, ডজ কিংসওয়ে, র্যাম্বলার, শেভ্রোলে ইম্পালা এবং অ্যাম্বাসেডরের মতো সে সময়ের অভিজাত ও আকর্ষণীয় সব গাড়ি জায়গা করে নিয়েছিল।
এর মধ্যে ডজ কিংসওয়ে গাড়ির প্রতি তার বিশেষ টান ছিল বলে জানা যায়, যা তৎকালীন সময়ে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। ষাটের দশকে শেভ্রোলে ইম্পালা নিয়ে তিনি ডায়মন্ড হারবারসহ কলকাতার বিভিন্ন স্থানে লং ড্রাইভে যেতেন। তার ব্যবহৃত অ্যাম্বাসেডর গাড়িগুলোর মধ্যে একটির নম্বর ছিল ৮৭৮৭, যা তার মৃত্যুর পরও দীর্ঘ সময় গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়িতে সংরক্ষিত ছিল।
এছাড়া তার ব্যবহৃত মরিস মাইনর গাড়িটি পরবর্তীতে চলচ্চিত্র প্রযোজক কেদারনাথ সেনের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল, যা পরে উত্তম কুমার ও তনুজা অভিনীত ‘রাজকুমারী’ চলচ্চিত্রেও দেখা গিয়েছিল। উত্তম কুমারের দীর্ঘদিনের সহকারী সাধন বাগচীর ভাষ্যমতে, তিনি নিজের গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে অত্যন্ত খুঁতখুঁতে ছিলেন। গাড়িতে কোনো অস্বাভাবিক শব্দ শুনলে তিনি দ্রুত তা পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করতেন এবং নিয়মিত গাড়ি ব্যবসায়ীদের কাছে নতুন মডেলের খোঁজখবর নিতেন।
তবে গাড়ির প্রতি এই প্রবল ভালোবাসা থাকলেও, বাস্তব জীবনে গাড়ি চালক হিসেবে তিনি খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। তার ছোট ভাই ও অভিনেতা তরুণ কুমারের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, উত্তম কুমার সাধারণত তার বিশ্বস্ত চালক ন্যাপা ও প্রভুর ওপরই গাড়ি চালানোর দায়িত্ব ছেড়ে দিতেন। যদিও তিনি মাঝে মাঝে শখের বশে স্টিয়ারিং ধরতেন, তবুও পেশাদার চালক হিসেবে তিনি নিজেকে খুব একটা দক্ষ মনে করতেন না।
অথচ রূপালি পর্দায় তার গাড়ি চালানোর দৃশ্যগুলো ছিল অত্যন্ত সাবলীল ও বিশ্বাসযোগ্য। ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সপ্তপদী’ চলচ্চিত্রে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে মোটরসাইকেলে তার সেই আইকনিক দৃশ্যটি আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত। ওই দৃশ্যের জন্য তিনি বিশেষ প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৬৩ সালের ‘দেয়া নেয়া’ চলচ্চিত্রে তিনি একজন গাড়িচালকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, যেখানে গাড়ি কেবল যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না, বরং গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল।
বাস্তবে গাড়ি চালানোয় খুব একটা স্বচ্ছন্দ না হওয়া সত্ত্বেও ক্যামেরার সামনে তিনি একজন দক্ষ চালকের অভিব্যক্তি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। তার এই পেশাদারিত্বই তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। আজ তার জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে অনুরাগীরা তার অভিনয়ের পাশাপাশি তার ব্যক্তিজীবনের এই শখ ও যাপনের গল্পগুলো নতুন করে স্মরণ করছেন।
গাড়ি সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর এই অভ্যাসটি তার বর্ণিল জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
