জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সহকারী কর কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুর পদোন্নতি আট বছরের জন্য স্থগিত করেছে সরকার। করদাতার কাছ থেকে ৩৮ লাখ টাকা গ্রহণ করে আয়কর নথির রেকর্ড পরিবর্তন এবং পুরোনো নথি হস্তান্তরের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপনটি কার্যকর করা হয়। জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু ঢাকা কর অঞ্চল-৫ এর সার্কেল-৯৩-এ সহকারী কর কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, সার্কেল-৯৩ এর করদাতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে নগদ ৩৮ লাখ টাকা গ্রহণ করেন এই কর্মকর্তা।
এর বিনিময়ে তিনি করদাতার আয়কর নথির অধিকাংশ রেকর্ড পরিবর্তন করে নতুন রেকর্ড সংযোজন করেন। এছাড়া পুরোনো আয়কর রিটার্ন, অর্ডার শিট, কর নির্ধারণী আদেশ এবং আপিল ট্রাইব্যুনালের আদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি করদাতার মনোনীত প্রতিনিধি ও আইনজীবীর কাছে হস্তান্তর করেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অসদাচরণ এবং দুর্নীতিপরায়ণতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তা তার লিখিত জবাবে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেন এবং ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন জানান। গত ১৬ মার্চ তার ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একজন তদন্তকারী কর্মকর্তাও নিয়োগ করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে দাখিল করা প্রতিবেদনে জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিভাগীয় মামলার নথিপত্র, তদন্ত প্রতিবেদন এবং অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ তাকে অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৪(২)(খ) অনুযায়ী তাকে আগামী আট বছরের জন্য পদোন্নতি না দেওয়ার লঘুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
একই আদেশে তাকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি দপ্তরের নথিপত্র পরিবর্তন এবং করদাতার সাথে অনৈতিক লেনদেনের এই ঘটনাটি রাজস্ব প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে কর প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযুক্ত কর্মকর্তা বর্তমানে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ থেকে মুক্তি পেলেও আগামী আট বছর তিনি কোনো ধরনের পদোন্নতি পাবেন না। এই দীর্ঘমেয়াদী দণ্ড তার কর্মজীবনের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি আরও একবার স্পষ্ট হলো। করদাতার নথি পরিবর্তন এবং অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের এই ঘটনাটি কর অঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের বিচ্যুতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
