হুদায়বিয়ার সন্ধির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাইয়াতে রিদওয়ান বা আল্লাহর সন্তুষ্টির শপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা. ) প্রায় ১৪০০ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করেন। এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত করা এবং ওমরাহ পালন করা।
সাহাবিরা যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই শুধুমাত্র ভ্রমণের উপযোগী সরঞ্জাম নিয়ে রওনা হয়েছিলেন। মক্কার মুশরিকরা এই সংবাদ পাওয়ার পর তাদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ ঠেকাতে বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় এবং আলোচনার জন্য প্রতিনিধি পাঠাতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে মক্কার কিছু উগ্র তরুণ যুদ্ধের উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করে।
তারা রাতের অন্ধকারে মুসলিম শিবিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করে তানঈম পাহাড় থেকে নেমে আসে। তবে মুসলিম প্রহরীদের সতর্কতার কারণে তাদের সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয় এবং তারা আটক হয়। মহানবী (সা. ) শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে তাদের ক্ষমা করে মুক্তি দিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর মহানবী (সা.
) হযরত ওসমান (রা.)-কে মক্কায় দূত হিসেবে পাঠান। তার উদ্দেশ্য ছিল মুশরিকদের কাছে সফরের মূল লক্ষ্য পরিষ্কার করা এবং মক্কায় অবস্থানরত দুর্বল ঈমানদারদের আশ্বস্ত করা। হযরত ওসমান (রা. ) মক্কায় পৌঁছে মুশরিক নেতাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেন। মুশরিকরা তাকে কাবা তওয়াফ করার প্রস্তাব দিলেও তিনি মহানবী (সা.)-এর অনুমতি ছাড়া তা করতে অস্বীকৃতি জানান।
এই বিলম্বের সুযোগে মক্কায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে হযরত ওসমান (রা.)-কে হত্যা করা হয়েছে। এই সংবাদ শোনার পর মহানবী (সা. ) সাহাবিদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি একটি বাবলা গাছের নিচে সাহাবিদের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন যে, তারা হযরত ওসমান (রা.)-এর হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে ফিরে যাবেন না।
এই শপথটিই ইতিহাসে বাইয়াতে রিদওয়ান নামে পরিচিত। মহানবী (সা. ) নিজের এক হাত অন্য হাতের ওপর রেখে হযরত ওসমান (রা.)-এর পক্ষ থেকে শপথ গ্রহণ করেন। এই শপথের খবর মক্কার মুশরিকদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার করে। তারা পরিস্থিতি বিবেচনা করে হযরত ওসমান (রা.)-কে মুক্তি দেয় এবং সন্ধি আলোচনার পথ প্রশস্ত হয়।
পবিত্র কোরআনের সুরা ফাতহ-এর ১৮ নম্বর আয়াতে এই শপথের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং অংশগ্রহণকারীদের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন হাদিস অনুযায়ী, এই শপথ গ্রহণকারী সাহাবিদের জান্নাতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা. ) থেকে বর্ণিত আছে যে, জিবরাইল (আ.)-এর আগমনের পর মহানবী (সা.
) সাহাবিদের শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান। আবু সিনান (রা. ) সর্বপ্রথম বিজয় অথবা শাহাদাতের শপথ গ্রহণ করেন এবং অন্যরা তাকে অনুসরণ করেন। এই ঘটনাটি মুসলমানদের ঐক্য ও সাহসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। হুদায়বিয়ার এই সন্ধি পরবর্তীতে মুসলমানদের জন্য বিজয়ের পথ সুগম করেছিল।
বাইয়াতে রিদওয়ান কেবল একটি শপথ ছিল না, বরং এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ যা যুদ্ধের তোড়জোড় থামিয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল। সাহাবিদের এই অটল আনুগত্য এবং মহানবী (সা.)-এর বিচক্ষণ নেতৃত্ব সেই সময়ে মক্কার মুশরিকদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য এবং দৃঢ়তা কীভাবে একটি সংকটময় পরিস্থিতিকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের এই অধ্যায়টি আজও মুসলমানদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
