কুমিল্লার আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার দুই অভিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মো. জাহিদুজ্জামান ও মো. শাহীন আলমের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। মঙ্গলবার ইন্টারপোল এই দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে রেড নোটিশ জারি করে। বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পলাতক এই দুই অভিযুক্তকে আন্তর্জাতিকভাবে শনাক্ত করা, তাদের অবস্থান নির্ণয় করা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী গ্রেফতারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি-ঢাকা ইন্টারপোলের মাধ্যমে এই রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইয়ের অনুরোধে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে ইন্টারপোল এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
তদন্তকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় মো. জাহিদুজ্জামান কুমিল্লা সেনানিবাসে সার্জেন্ট হিসেবে এবং মো. শাহীন আলম সৈনিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাদের এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঘটনার পরবর্তী পর্যায়ে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দিলে তাদের নমুনা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
তবে বর্তমানে তাদের অবস্থান অজ্ঞাত এবং তারা পলাতক রয়েছেন। এই মামলায় গত ২১ এপ্রিল অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বর্তমানে কুমিল্লা কারাগারে রয়েছেন। হাফিজুর রহমান সেনাবাহিনীর সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার এবং ২০২৩ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তনু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে টিউশনি করতে গিয়ে সোহাগী জাহান তনু নিখোঁজ হন। পরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তার মরদেহ পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার পরদিন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ইয়ার হোসেন ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের একজন অফিস সহায়ক ছিলেন, যিনি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। মামলার তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ ওই প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে না পাওয়ার কথা জানায়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই তদন্ত করছে। তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন সময় সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের অবস্থান নিশ্চিত করতে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই নোটিশের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অভিযুক্তদের সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান এবং গ্রেফতারের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারবে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে এবং পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের জন্য সব ধরনের আইনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।
তনু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ বছর পার হলেও বিচারপ্রার্থী পরিবার ও সচেতন মহলের নজর এখন এই মামলার তদন্ত ও অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দিকে।
