ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত সিলেট-আখাউড়া রেলপথটি ১১০ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি। ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে পণ্য পরিবহনের উদ্দেশ্যে স্থাপিত এই ২৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটি বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে এই অঞ্চলের বাসিন্দারা রেলপথটি ডাবল লাইনে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ব্রিটিশ আমলের পুরোনো অবকাঠামোতেই ধুঁকে ধুঁকে চলছে ট্রেন চলাচল। বর্তমানে একটি মাত্র লাইন থাকায় ট্রেন চলাচলের সময় ক্রসিংয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, এই রেলপথের অধিকাংশ স্থানে নাট-বল্টু, ফিশপ্লেট ও ক্লিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে বল্টুর পরিবর্তে সুতো দিয়ে রেললাইন বেঁধে রাখার মতো ঝুঁকিপূর্ণ চিত্রও চোখে পড়ে।
এছাড়া শতবর্ষী পুরোনো সেতুগুলোও বর্তমানে নাজুক অবস্থায় রয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। নিয়মিত ট্রেন যাত্রীরা জানান, বর্তমানে ঢাকা থেকে সিলেট পৌঁছাতে প্রায় আট ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। রেলপথটি ডাবল লাইনে উন্নীত করা হলে এই সময় অর্ধেকে নেমে আসবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ও দীর্ঘ যাত্রার ভোগান্তির কারণে অনেক ব্যবসায়ী এখন সড়কপথের বাসে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
পাহাড়ি এলাকায় ট্রেনের গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় এবং ক্রসিং জটিলতার কারণে এই রুটে ট্রেনযাত্রা এখন চরম ভোগান্তির নামান্তর। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, জনবল ও ইঞ্জিন সংকটের অজুহাতে গত কয়েক বছরে এই রুটের বেশ কিছু লোকাল ট্রেন ও স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিদিন লাখো মানুষ প্রকৃত রেলসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও যাত্রীদের দাবি, কেবল গেজ পরিবর্তন বা ব্রডগেজে রূপান্তর করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাদের মতে, একক লাইনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে ডাবল লাইন নির্মাণই একমাত্র কার্যকর উপায়। কারণ লাইন ব্রডগেজ করা হলেও ক্রসিংয়ের সমস্যা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর ঝুঁকি থেকেই যাবে। এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে ভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, সরকারিভাবে সিলেট-আখাউড়া রেলপথকে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের বিষয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিনি আরও জানান, রেলপথটি ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হলে নতুন ট্রেন সংযোজন করা সম্ভব হবে এবং ভিন্ন মাপের দুটি ট্রেন একই সঙ্গে চলাচল করতে পারবে।
তবে স্থানীয় স্টেশনমাস্টাররা জানিয়েছেন, ডাবল লাইন নির্মাণের বিষয়ে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তারা কেবল ব্রডগেজ করার পরিকল্পনার কথা শুনেছেন। কুলাউড়া ও শমশেরনগর স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, ডুয়েলগেজ বা ব্রডগেজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নতুন ও পুরাতন ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। তবে দীর্ঘদিনের এই দাবি পূরণ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
ব্রিটিশ আমলের এই রেলপথটি সংস্কারের নামে কেবল টুকটাক কাজ করা হলেও বড় ধরনের কোনো টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ না করায় যাত্রীরা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকির মধ্যে চলাচল করছেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে রেলপথটির আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
