বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুতের অভাবের কারণে রোগীদের রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যনিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এর ২০২৬ সালের জুলাই মাসের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের মাত্র ২২ শতাংশ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত ছিল। এই গবেষণায় দেশের আট বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পর্যালোচনা করা হয়েছে।
তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা ছিল মাত্র ১১. ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই হার ২৩. ৯ শতাংশ। পিপিআরসি-র এই গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, সরকারি ওষুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) মোট ওষুধের প্রায় ৬২ শতাংশ সরবরাহ করে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সময়মতো এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সরকারি হাসপাতালে ওষুধের প্রাপ্যতা প্রায় ৯০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৯৮ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সরকারি হাসপাতালের ফার্মেসিতে ওষুধের অভাব দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নথিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় মেডিকেল স্টোরস ডিপো এবং মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মধ্যে চাহিদা নিরূপণ ও পূর্বাভাস তৈরিতে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের সঠিক বরাদ্দ ও সরবরাহ বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মিলছে না।
বিশ্বব্যাংকের একটি নথিতেও সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ওষুধের ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা থাকা ওষুধগুলো অনেক সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাওয়া যায় না, যার ফলে রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি সরবরাহকারীর কাছ থেকে নিজেদের খরচে ওষুধ কিনতে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আউট-অব-পকেট স্বাস্থ্যব্যয়ের ৬৯. ৪ শতাংশই ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর পেছনে ব্যয় হয়। সরকারি হাসপাতালে ওষুধ না পাওয়ার ফলে নিম্নআয়ের রোগীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা অনেক সময় চিকিৎসার ধারাবাহিকতা নষ্ট করে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধ না পাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে জানিয়েছিল, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২৫০ ধরনের বহুল ব্যবহৃত ওষুধ বাজারমূল্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দামে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় জাতীয় প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, আগে এই তালিকাটি ২০১৬ সালের ছিল। নতুন তালিকায় বর্তমান রোগের ধরন, কার্যকারিতা, এবং ব্যয়সাশ্রয়িতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ওষুধের চাহিদা নিরূপণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ডিজিটাল এবং তথ্যনির্ভর করতে হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। রিয়েল-টাইম সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়াতেও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে। হাসপাতালের ওষুধের মজুত ও সরবরাহের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
