বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে সর্বশেষ বেতন কাঠামো বা পে কমিশন কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বেতন ও মজুরি সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ জমা পড়েছিল। এর মধ্যে জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।
অন্যদিকে, সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন শ্রম সংস্কার কমিশন জাতীয় পর্যায়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শ্রমজীবী মানুষের বিশাল আত্মত্যাগ থাকলেও শ্রম কমিশনের সুপারিশগুলো সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হারও ছিল সীমিত, যা তৎকালীন মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় কম ছিল। বর্তমানে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বেতন কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
সরকারের আর্থিক অবস্থা বর্তমানে বেশ নাজুক। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধ, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি প্রদান এবং জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট রয়েছে। বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সীমিত করে দিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসনের জন্য ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে বেতন কমিশন অনুযায়ী ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়াতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এই বিশাল অংকের অর্থ সংস্থান করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের সামনে এখন দুটি প্রধান পথ খোলা রয়েছে: আয় বাড়ানো অথবা ব্যয় কমানো। করের আওতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধ করার কথা বলা হলেও মানুষের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা খুব একটা ভালো নয়।
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে সাধারণ মানুষের বাড়তি কর দেওয়ার মতো অবস্থা নেই। ফলে সরকারি ব্যয় কমানোর বিষয়টি এখন সামনে চলে এসেছে। অতীতে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯৩ সালে গঠিত প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন কমিটি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সংখ্যা কমিয়ে ব্যয় সংকোচনের সুপারিশ করেছিল, যা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমান সরকার চাইলে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল, বিলাসিতা পরিহার এবং সরকারি কর্মকর্তাদের অহেতুক প্রশিক্ষণ ও ভাতার নামে ব্যয় কমিয়ে অর্থের জোগান দিতে পারে। এছাড়া সরকারি প্রকল্পের গাড়ি ব্যক্তিগত ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করা এবং অপ্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সরকারি ব্যয় কমানোর উপায় খুঁজে বের করতে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা এবং সেই সুপারিশ বাস্তবায়নে কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
দেশে আয়বৈষম্য বর্তমানে বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীরা যখন নিয়মিত বেতন ও উৎসব ভাতা পান, তখন বেসরকারি খাতের বহু মানুষ চাকরি হারানো বা বেতন হ্রাসের সংকটে ভোগেন। এই বৈষম্য সমাজে 'আমরা বনাম ওঁরা' নামক এক বিভাজন তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতার কারণ হতে পারে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সাধারণ তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল।
তাই সরকার যদি কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের দাবি শোনে এবং সাধারণ মানুষের কথা উপেক্ষা করে, তবে তা বড় ধরনের অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে। সরকারের উচিত সমাজের সব স্তরের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়া এবং বৈষম্য কমিয়ে আনার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
