সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছেন প্রায় সাত লাখ চাকরিপ্রার্থী। ১ হাজার ১২২টি শূন্য পদের বিপরীতে গত বছরের আগস্ট মাসে এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত পরীক্ষার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারিত হয়নি।
নিয়োগপ্রক্রিয়াটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে পরীক্ষা আয়োজনে বিলম্ব করছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নিয়োগ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও উপাত্ত পিএসসির কাছে পাঠানো হয়েছে। এখন পিএসসি তাদের সুবিধামতো সময়ে পরীক্ষার তারিখ ও সময়সূচি ঘোষণা করবে।
পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ১২২টি পদের বিপরীতে প্রায় সাত লাখ প্রার্থী আবেদন করেছেন। সেই হিসাবে প্রতিটি পদের বিপরীতে গড়ে ৬২৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রে আয়োজন করা একটি বড় প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিয়োগ পরীক্ষার নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীদের ৯০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা এবং ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রার্থীদের ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর অর্জন করতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়াটি শুরুতে ২ হাজার ১৬৯টি পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই পরিবর্তনের ফলে সরাসরি নিয়োগের পদের সংখ্যা কমে ১ হাজার ১২২টিতে নেমে আসে। নিয়োগপ্রক্রিয়াটি শুরুর পর উচ্চ আদালতের একটি স্থগিতাদেশের কারণে আইনি জটিলতা তৈরি হয়, যার ফলে পরীক্ষা আয়োজন স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রতি সেই আইনি জটিলতার অবসান হলেও নতুন করে প্রশাসনিক সংকটের সৃষ্টি হয়। গত ১৮ আগস্ট পিএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলে সাংবিধানিক এই পদটি শূন্য হয়ে যায়।
এরপর ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়াকে পিএসসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণ করায় এখন পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। সরাসরি নিয়োগের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির বিষয়টিও দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে আছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার কথা। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে গত ১৩ বছর ধরে এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। গত জুন মাসে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ পদোন্নতির বিষয়ে রায় প্রদান করলে দীর্ঘদিনের এই জটিলতার নিরসন হয়।
তবে আদালতের রায়ের লিখিত কপি এখনো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের হাতে পৌঁছায়নি। রায়ের কপি পাওয়ার পর পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে সারা দেশে ৬৫ হাজার ৪৫৭টি অনুমোদিত প্রধান শিক্ষকের পদের মধ্যে ৩৪ হাজার ১৫৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এই পদগুলোতে বর্তমানে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
একদিকে সরাসরি নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা সাত লাখ প্রার্থী, অন্যদিকে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা সহকারী শিক্ষকেরা—সব মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা খাতে প্রধান শিক্ষকের সংকট নিরসনে দুটি প্রক্রিয়াই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। পিএসসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
