বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়কাল কোনো সরকারের সামগ্রিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট না হলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু বড় ধরনের দুর্বলতা বা 'ফল্ট লাইন' পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই দুর্বলতাগুলো ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটের জন্ম দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সরকার একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, যেখানে গণতন্ত্র সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় ছিল।
তবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসায় সরকারের সামনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পুঁজি ও সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা সরকারের রয়েছে। বর্তমান সরকারের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান মানদণ্ড গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, উদার গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরির জন্য নির্বাচনের পাশাপাশি ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, সরকারের কাজের পদ্ধতিতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, ধর্ম-বর্ণ-নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নির্বিশেষে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, এই তিনটি ক্ষেত্রেই সরকার বড় ধরনের দুর্বলতার পরিচয় দিচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে সরকার নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগী, কিন্তু সেই ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কোনো কার্যকর কাঠামো তৈরি করছে না।
গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাষ্ট্র যেন নাগরিকের অধিকার হরণ করতে না পারে, এমন ভারসাম্য তৈরির চেয়ে সরকারের সদিচ্ছার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আমলাতন্ত্রের ওপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নীতি প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার জনগণের কাছ থেকে মতামত নিচ্ছে না এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানেও ঘাটতি রয়েছে। সরকার ও জনগণের মধ্যে এই দূরত্ব বাড়লে তা গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে। এছাড়া সামাজিক ক্ষেত্রে একধরনের অসহিষ্ণুতা বা 'সামাজিক স্বৈরতন্ত্র' লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে একটি গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর ওপর নিজেদের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
সাভারে ওরস বন্ধের মতো ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 'তৌহিদি জনতা'র ব্যানারে কনসার্ট, সিনেমা প্রদর্শন বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের মতো কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলসহ সব রাজনৈতিক দলকে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
যদি রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একমত না হয়, তবে তাদের নেতা-কর্মীদের বিরত রাখতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জনগণের কাছে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে এই তিনটি বড় 'ফল্ট লাইন' বা দুর্বলতা আমাদের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রাকে গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, এই সমস্যাগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকারের একধরনের দ্বিধা ও অনিচ্ছা দেখা যাচ্ছে, যার পরিণতি ভবিষ্যতে ভালো না-ও হতে পারে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য, জনগণের সাথে কার্যকর যোগাযোগ এবং সকল নাগরিকের অধিকার রক্ষায় সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ। সরকার যদি এই দুর্বলতাগুলো দূর করতে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
