আমাদের সমাজে গায়ের রং নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো গভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। জনপ্রিয় অভিনেতা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসান মাসুদ নিজের গায়ের রং নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং আমাদের সমাজের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একজন মানুষ কেন নিজের গায়ের রঙের কারণে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেকে অযোগ্য মনে করতে বাধ্য হন।
এই ধরনের মানসিকতা প্রমাণ করে যে, আমরা মুখে সমতার কথা বললেও বাস্তবে বর্ণবাদী আচরণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। আমাদের সমাজে গায়ের রংকে সৌন্দর্য, রুচি এবং বিয়ের যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, সে নিজের গায়ের রং সম্পর্কে সচেতন থাকে না।
কিন্তু বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় পরিবার, সমাজ এবং চারপাশের মানুষের মন্তব্যের কারণে সে শিখতে শুরু করে যে ফর্সা হওয়া ভালো এবং কালো হওয়া খারাপ। এই শিক্ষা তাকে আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং হীনম্মন্যতায় ভোগায়। বিয়ের বাজারে গায়ের রঙের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। একজন নারীর উচ্চশিক্ষা, ভালো চাকরি বা চমৎকার ব্যক্তিত্ব থাকলেও বিয়ের ক্ষেত্রে তার গায়ের রংকে প্রধান যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়।
ফর্সা হলে তাকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়, আর শ্যামলা বা কালো হলে তাকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য বিদ্যমান, তবে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক ক্ষমতা অনেক সময় গায়ের রঙের ঘাটতি পূরণ করে দেয়। নারীর ক্ষেত্রে এই ছাড় খুবই কম। এই বৈষম্যের দায় কেবল পুরুষের নয়, বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পুরো সমাজের।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নারীরাই অন্য নারীর গায়ের রং নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন। একজন মা যখন তার ছেলের জন্য বউ খুঁজতে গিয়ে মেয়ের গায়ের রং নিয়ে আপত্তি তোলেন, তখন তিনি মূলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখেন। সৌন্দর্যের এই ধারণা তৈরিতে গণমাধ্যম এবং বিজ্ঞাপনের ভূমিকাও অনস্বীকার্য।
দীর্ঘদিন ধরে প্রসাধনী পণ্যের বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছে যে, ফর্সা হওয়া মানেই জীবনের সব দরজা খুলে যাওয়া। এই বার্তা মানুষের মনে গেঁথে দিয়েছে যে, বর্তমান চেহারাটি যথেষ্ট নয় এবং ফর্সা হওয়ার মাধ্যমেই ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। আমাদের দৈনন্দিন ভাষার মধ্যেও বর্ণবাদ মিশে আছে। আমরা যখন কাউকে গায়ের রং নিয়ে মন্তব্য করি, তখন তা হয়তো নিছক মজা মনে হতে পারে, কিন্তু সেই শব্দের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়।
একটি শিশুকে বারবার তার গায়ের রং নিয়ে ছোট করা হলে সে নিজেকে অন্যের চোখে দেখতে শুরু করে, যা তার মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। আমরা উচ্চশিক্ষিত হয়েও অনেক সময় এই কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে পারি না। আমরা অন্য দেশের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও নিজের ঘরের বিয়ের আলোচনায় গায়ের রংকে প্রাধান্য দিই।
এই দ্বিমুখী আচরণ আমাদের সামাজিক ভণ্ডামির পরিচয় দেয়। পরিবর্তন আনতে হলে পরিবার থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুকে গায়ের রঙের ভিত্তিতে বিচার না করে তার সুস্থতা এবং মানবিক গুণাবলির প্রশংসা করতে হবে। নবজাতককে দেখে গায়ের রঙের প্রশংসা না করে তার আগমনের আনন্দ উদযাপন করা উচিত। সন্তানকে রোদে খেলতে দেখে কালো হয়ে যাওয়ার ভয় না দেখিয়ে ত্বকের যত্নের পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।
আমাদের চোখের অভ্যাস বদলানো জরুরি। মানুষ দেখার আগে তার রং না দেখে তার ব্যক্তিত্ব ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দিতে শিখতে হবে। যেদিন আমরা মানুষের গায়ের রঙের চেয়ে তার পরিচয়কে বড় করে দেখব, সেদিনই হাসান মাসুদের মতো কাউকে আর নিজের গায়ের রং নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতে হবে না।
সত্যিকারের পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন আমরা শুধু অন্যের গায়ের রং নয়, বরং নিজের ভেতরের অন্ধকার বা সংকীর্ণ মানসিকতাটুকুও দেখতে শিখব। সমাজ থেকে এই বৈষম্য দূর করতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। মানুষ হিসেবে একে অপরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং গায়ের রঙের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মূল্যায়ন করাই হতে পারে এই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
