বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি ঘোষণা করেছে। এই দর্শনের ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, ইনসাফভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ও সুশাসন সুদৃঢ় করতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালী-বিধির ৭১ বিধিতে দেওয়া মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব কথা বলেন।
সরকারি কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তিন সদস্যের পরিবীক্ষণ টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। এই টিম দৈবচয়নের ভিত্তিতে বিভিন্ন দপ্তর পরিদর্শন করে কার্যক্রমের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক গঠিত এই পরিবীক্ষণ টিম এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে।
যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোক্তার আলী তার নোটিশে দুর্নীতি, অনিয়ম, অপচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে স্থায়ী পরিবীক্ষণ সেল গঠনের দাবি জানান। তিনি বলেন, নিয়মিত পরিবীক্ষণ, কর্মসম্পাদনের মূল্যায়ন ও ঝুঁকি নিরূপণের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় ঠেকানো এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে তদারকি ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও নিয়মিত পরিবীক্ষণ এবং অনিয়মের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে একটি নিবেদিত পরিবীক্ষণ সেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার আগে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান পরিচালনার জন্য এনফোর্সমেন্ট ইউনিট কার্যকর রয়েছে। এছাড়া অভিযোগ গ্রহণে ১০৬ হটলাইনের পাশাপাশি ৯৯৯ ও ৩৩৩ এর মতো জাতীয় হটলাইনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম বা অসদাচরণের তথ্য পাওয়া গেলে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এছাড়া দুর্নীতি দমন আইন, ২০০৪, দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধিসহ প্রযোজ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের বহুমাত্রিক তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি, প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়ন সেল ও উন্নয়ন শাখা এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ এবং এডিপি মনিটরিং সিস্টেমের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সরকারি সেবার মান উন্নয়ন, প্রকল্প ও কর্মসূচির সময়মতো বাস্তবায়ন, সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়াতে গভর্নমেন্ট পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেম প্রবর্তন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ নয়, বরং এমন একটি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে দুর্নীতির সুযোগ ক্রমাগত সংকুচিত হবে। সরকারি কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং জনগণকে দ্রুত ও হয়রানিমুক্তভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। নোটিশের পর সম্পূরক প্রশ্নে মো. মোক্তার আলী এমপি বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে আইনের শাসন, কঠোর প্রশাসন এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইনের শাসন বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সরকার কাজ করছে এবং এ ক্ষেত্রে জনগণকে পাহারাদার হিসেবে কাজ করতে হবে।
