সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় ইব্রাহিম খলিল, জাফর আহমেদ ও আনিসুজ্জামান রায়হান নামের তিন আইনজীবী আহত হয়েছেন। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার পর সমিতির শহীদ সফিউর রহমান মিলনায়তনের সামনে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে প্রথমে কথাকাটাকাটি এবং পরে হাতাহাতি শুরু হয়।
কিছু সময় ধরে ধাক্কাধাক্কির পর পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও অল্প সময়ের মধ্যে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা ৬টার দিকে একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনজীবী জাফর আহমেদের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হয়। এর প্রায় ১৫ মিনিট পর সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের দিকে সমিতির ব্যাডমিন্টন খেলার মাঠের পাশে ইব্রাহিম খলিলকে কয়েকজন আইনজীবী মারধর করেন।
এর কিছুক্ষণ পর বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষকে সেখানে মারামারিতে জড়াতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের আইনজীবী সমিতির চেম্বারেও কয়েকজন আইনজীবী হামলা করেন। পরে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সন্ধ্যার পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে পুলিশ ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
তবে এ ঘটনায় কোনো মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি। এই সংঘর্ষের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মধ্যকার বিভাজন প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। এর আগে, মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দুই পক্ষ স্লোগান দিতে দিতে মুখোমুখি অবস্থান নেয় এবং একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়ে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কর্মরত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলরা একটি শোভাযাত্রা বের করেন। শোভাযাত্রাটি অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের দিকে যাওয়ার সময় সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া নিয়োগবঞ্চিত বলে দাবি করা বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের একটি অংশের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
এই বিরোধের পেছনে রয়েছে আইন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। গত ৩০ জুলাই সরকার আগের সব আইন কর্মকর্তার নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে ২৬৫ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়। এরপর বাদ পড়া আইন কর্মকর্তা এবং নিয়োগপ্রত্যাশী কিন্তু নিয়োগ না পাওয়া আইনজীবীদের একটি অংশ প্রতিবাদ শুরু করেন।
তাদের অভিযোগ, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এ নিয়ে তারা বিভিন্ন সময়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। মঙ্গলবারের সংঘর্ষের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী কামরুল ইসলাম সজল ঘটনাটিকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, তারুণ্যের উন্মাদনায় এটি হয়েছে। এছাড়া তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কর্মরত আইন কর্মকর্তাদের দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কর্মরত আইন কর্মকর্তারা কি দলের কর্মসূচিতে যোগদান করতে পারেন? তারা তো রাষ্ট্রের কর্মকর্তা। এটি সরকার ও দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যার সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে নিয়োগ নিয়ে চলমান বিরোধ প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য হাতাহাতি ও মারামারিতে গড়াল।
