বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনের দুই সন্তান ইয়াসমীন ফাইরুজ বাঁধন এবং রাফি হোসেন শ্রাবণ নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা সংগীতের ভুবনে অসামান্য অবদান রাখা সাবিনা ইয়াসমীনের দুই সন্তান সংগীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণ না করলেও তারা তাদের কর্মজীবনে সফলতার পরিচয় দিয়েছেন।
সাবিনা ইয়াসমীনের বড় মেয়ে ইয়াসমীন ফাইরুজ বাঁধন বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে কর্মরত আছেন। অন্যদিকে, তার ছেলে রাফি হোসেন শ্রাবণ লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। সাবিনা ইয়াসমীন জানান, তিনি তার সন্তানদের ওপর কখনোই কোনো পেশা চাপিয়ে দেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, জীবনের প্রকৃত সাফল্য পেশার ধরনের ওপর নয়, বরং কাজের আনন্দ এবং সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করে।
তার দুই সন্তান নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী পথ বেছে নেওয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্বিত। সাবিনা ইয়াসমীনের মেয়ে বাঁধন তার শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে অতিবাহিত করেছেন। তিনি ঢাকার ম্যাপললিফ স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর ভারতের উত্তর প্রদেশের মুসোরিতে অবস্থিত উডস্টক স্কুলে হাইস্কুল সম্পন্ন করেন।
এরপর তিনি বেঙ্গালুরুর গভর্নমেন্ট ফার্স্ট গ্রেড কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওলোংগং থেকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ২০০২ সালে দেশে ফিরে তিনি ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হন। বাঁধন জানান, ওয়ান ব্যাংকে ছয় বছর এবং অন্য একটি ব্যাংকে আরও ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আছেন।
বর্তমানে তিনি ওই ব্যাংকের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছোটবেলায় গানের পরিবেশে বড় হলেও তিনি সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নেননি। তিনি জানান, তার মায়ের সংগীতময় জীবনের ছায়ায় বড় হলেও তিনি নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যাংকিং খাতকে বেছে নিয়েছেন এবং তার মা তাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন।
সাবিনা ইয়াসমীনের ছেলে রাফি হোসেন শ্রাবণ, যিনি পরিবারের কাছে শ্রাবণ নামে পরিচিত, তিনি তার বড় বোনের চেয়ে আট বছরের ছোট। তিনি ঢাকার র্যাডিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ও লেভেল এবং এ লেভেল সম্পন্ন করেন। সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে তিনি প্রায় দেড় দশক আগে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান এবং সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।
সাবিনা ইয়াসমীন জানান, শ্রাবণ সংগীতের প্রতি ভালোবাসা থেকেই লন্ডনে পড়াশোনা করতে গিয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত সে পেশাগতভাবে সংগীতকে বেছে নেয়নি। বর্তমানে শ্রাবণ লন্ডনের পরিচিত ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রয় প্রতিষ্ঠান হল্যান্ড অ্যান্ড ব্যারেটে কর্মরত আছেন। সেখানে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। সংগীতের কিংবদন্তি সাবিনা ইয়াসমীন শিশুশিল্পী হিসেবে সংগীতজগতে প্রবেশ করেন।
রবিন ঘোষের সংগীতে নতুন সুর চলচ্চিত্রে প্রথম গান গাওয়ার পর ১৯৬৭ সালে জহির রায়হানের আগুন নিয়ে খেলা চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। আলতাফ মাহমুদের সংগীতে গাওয়া মধু জোছনা দীপালি গানটি তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি ১৬ হাজারের বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।
তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক এবং ১৪ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন। সাবিনা ইয়াসমীন বলেন, তিনি তার সন্তানদের বড় করার সময় সবসময় সুর ও সংগীতের আবহে রেখেছেন, তবে তাদের নিজস্ব পছন্দের প্রতি তিনি সবসময় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি মনে করেন, সন্তানেরা অনেক সময় মা-বাবার পেশায় আসতে চায় না এবং এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি বিষয়।
তার দুই সন্তান বর্তমানে যে অবস্থানে আছেন, তাতে তিনি অত্যন্ত তৃপ্ত। সাবিনা ইয়াসমীনের জীবনের গল্প যেমন সুর ও ছন্দে ঘেরা, তেমনি তার পারিবারিক জীবনও স্নেহ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় পূর্ণ। তিনি তার সন্তানদের সফলতায় একজন গর্বিত মা হিসেবে নিজের সন্তুষ্টির কথা প্রকাশ করেন।
