একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের শুরু তার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। যেকোনো নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিশুদের সাধারণত কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয় এবং স্কুলের পরিবেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় অনেক শিশুর কাছে স্কুলের পরিবেশ, শিক্ষক এবং সহপাঠীরা সম্পূর্ণ অপরিচিত থাকে।
এই কারণে প্রথম কয়েক দিন স্কুলে যেতে না চাওয়া, বাবা-মাকে আঁকড়ে ধরে রাখা কিংবা কান্নাকাটি করাকে অস্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করা হয় না। শিশুর জন্য স্কুলের শুরুটা স্বস্তিদায়ক ও ইতিবাচক করতে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের দায়িত্ব হলো প্রথম দিকে শিশুকে স্কুলের সহপাঠী, পরিবেশ এবং শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
শিশুকে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই হঠাৎ করে প্রথম দিন স্কুলে নিয়ে গিয়ে ক্লাসে বসিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। অপরিচিত পরিবেশ, নতুন শিক্ষক এবং অচেনা সহপাঠীদের মাঝে হঠাৎ নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলে অনেক শিশুর মনে ভয় বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই স্কুলে যাওয়ার আগেই ধীরে ধীরে শিশুকে নতুন পরিবেশের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করা জরুরি।
এই প্রস্তুতি ছোট ছোট বিষয়ের মাধ্যমে শুরু হতে পারে। যেমন, স্কুলের ব্যাগ, জুতা, পোশাক, খাতা ও কলমের মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার সময় শিশুকে সঙ্গে রাখা। শিশুকে নিজের পছন্দের জিনিস বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে স্কুল নিয়ে তার আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
সরঞ্জাম কেনা ছাড়াও শিশুকে স্কুলে তাকে কী করতে হবে সে সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন কখন স্কুলে যেতে হবে, সেখানে কতক্ষণ থাকতে হবে এবং ক্লাসে কীভাবে সময় কাটবে—এই বিষয়গুলো সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলা উচিত। এতে শিশুরা স্কুলে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ পায়।
এছাড়া শিশুকে স্কুলের ছবি বা ভিডিও দেখিয়ে বাড়িতেই স্কুল সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেওয়া যেতে পারে। বই, খাতা কিনে দেওয়া এবং শিক্ষক সম্পর্কে সুন্দর ধারণা দেওয়ার মাধ্যমে শিশুরা নতুন বিষয়টি উপভোগ করতে পারে, যা তাদের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে এবং প্রথম দিন থেকেই আগ্রহ জন্মায়।
সহপাঠীদের বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি, যেখানে পরিবারের সাহায্য প্রয়োজন। শিশুরা যাতে একসঙ্গে খেলতে বা পড়াশোনা করতে ভালোবাসে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। প্রথম দিন শিশুকে স্কুলে নিয়ে গিয়ে সহপাঠীদের সাথে ভালোভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং সম্ভব হলে স্কুল শেষে তাদের সঙ্গে কিছুটা সময় খেলতে দেওয়া প্রয়োজন।
এছাড়া মাঝে মাঝে সহপাঠীদের বাসায় দাওয়াত দিলে ধীরে ধীরে তারা শিশুর বন্ধু হয়ে ওঠে।
স্কুলজীবন শুরু হলে অনেক অভিভাবক পড়াশোনা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। সন্তান অন্যদের তুলনায় ধীরে পড়া শিখছে, ক্লাসের বিষয় দ্রুত বুঝতে পারছে না কিংবা বাড়ির পড়া সময়মতো শেষ করতে পারছে না—এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ শিশুকে বকাঝকা করেন বা শারীরিক শাস্তি দেন। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে বলা হয় যে তার দ্বারা কিছু হবে না অথবা সে সহজ পড়াও পারে না।
তবে শিশুকে শেখানোর বদলে বারবার তিরস্কার বা ভয় দেখালে তার শেখার আগ্রহ বাড়ে না, বরং পড়াশোনার সঙ্গে নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে স্কুলে যাওয়া, বই খোলা কিংবা পড়তে বসার বিষয়টি শিশুর কাছে ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে, যা তার আত্মবিশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলে এবং স্কুলের প্রতি অনীহা তৈরি করে।
তাই স্কুল জীবনের শুরুতেই শিশুকে পড়া শেখার জন্য তাড়াহুড়া না করে তাকে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত।
শিশুর স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাবার খাওয়া, পোশাক পরা, বই-খাতা গোছানো এবং চুল বাঁধার মতো কাজে পরিবারের সবার আগ্রহ দেখানো এবং অংশগ্রহণ করা উচিত। এতে শিশুর কাছে স্কুলে তৈরি হওয়ার সময়টা কান্নাকাটি নয়, বরং আনন্দের হয়ে ওঠে। এছাড়া শিশুদের স্কুল ব্যাগ, পানির বোতল, শার্পনার এবং পেন্সিল কেসের মতো আকর্ষণীয় শিক্ষা উপকরণ কিনে দেওয়া উচিত।
সম্ভব হলে কেনার সময় শিশুকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া এবং তার পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হলে শিশুদের পড়াশোনার আগ্রহ দ্বিগুণ হয়ে ওঠে এবং তারা আনন্দ নিয়ে শিখতে পারে।
