শনিবার রাত ৯টার দিকে দেশে মোট ২ হাজার ২৫৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি-এর তথ্য থেকে জানা গেছে। ওই সময় দেশে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৭ মেগাওয়াট। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শনিবার রাত ৯টায় ঢাকা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে।
ওই সময়ে ঢাকা জোনে ৬ হাজার ১৮২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৭৫৯ মেগাওয়াট। লোডশেডিংয়ের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা জোন। সেখানে ২ হাজার ৫৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৬২ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া কুমিল্লা জোনে ১ হাজার ৬৭২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৩৮ মেগাওয়াট এবং ময়মনসিংহ জোনে ১ হাজার ৪১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৩৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
রাজশাহী জোনে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ২০৪ মেগাওয়াট। চট্টগ্রাম জোনে ১৭৭ মেগাওয়াট, রংপুর জোনে ১৪২ মেগাওয়াট এবং সিলেট জোনে ১৩৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে কম লোডশেডিং হয়েছে বরিশাল জোনে, যেখানে ১০৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, কয়লা সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে। বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যার কারণে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে পিক আওয়ার বা সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে এই ঘাটতি প্রকট হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় লোডশেডিংয়ের মাত্রাও ভিন্ন হচ্ছে। ঢাকা অঞ্চলে জনবসতি এবং শিল্পকারখানার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানে বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, যার ফলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি-এর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ৯টার এই চিত্রটি দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কারিগরি সক্ষমতা পুরোপুরি বজায় না রাখা পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কয়লার মজুত ঠিক রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া পুরনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি নিরসনে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি উন্নতির জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছে। তবে বর্তমানে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তা দিয়ে দেশের সামগ্রিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকায় দেশের প্রতিটি অঞ্চলে কমবেশি লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হচ্ছে গ্রাহকদের।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির এই অস্থিরতা জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন এবং দৈনন্দিন কাজে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ভোগান্তি বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছে। তবে জ্বালানি সংকট এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন হতে পারে। সামগ্রিকভাবে দেশের বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট নিরসনে জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি-এর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাত ৯টার এই লোডশেডিংয়ের পরিসংখ্যান দেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির প্রতিফলন। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
