রাজবাড়ী কাপড়বাজারে ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে জাকিয়া সুলতানা নামের এক নারী উদ্যোক্তাকে পুলিশের পাহারায় থাকা অবস্থায় প্রকাশ্যে লাথি মারার ঘটনা ঘটেছে। ২৯ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সদর থানা পুলিশের সদস্যরা যখন ওই নারীকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কয়েকজন যুবক পেছন থেকে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং একের পর এক লাথি মারতে থাকে।
রাষ্ট্রীয় পাহারার ভেতরে থাকা অবস্থায় একজন নাগরিকের ওপর এমন হামলার ঘটনা আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সময় পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলাকারীরা এই তাণ্ডব চালায়, যা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জাকিয়া সুলতানা রাজবাড়ীর একজন পরিচিত নারী উদ্যোক্তা, যিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জেলাজুড়ে প্রায় চার হাজার নারী কর্মীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন বলে দাবি করেছেন।
ব্যবসায়িক বিরোধের সূত্রপাত হয় তাঁর প্রতিষ্ঠানের একজন সাবেক নারী কর্মীর বেতন প্রদান ও অসদাচরণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জাকিয়া সুলতানা বাজার কল্যাণ সমিতির নেতাদের সঙ্গে অসদাচরণ করেছেন এবং সালিসি সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে এই বিরোধের জেরে তাঁকে যেভাবে জনসমক্ষে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যবসায়িক মতপার্থক্য বা বিরোধ নিরসনের জন্য বাজার কল্যাণ সমিতি ও আইনি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ থাকলেও, রাজপথে এমন শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শামিল। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে একে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যখন কোনো সমাজে রাষ্ট্র বা আইনের শাসনের চেয়ে তাৎক্ষণিক শারীরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রবণতা বেড়ে যায়, তখন তা একটি বিষাক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতির জন্ম দেয়।
পুলিশের উপস্থিতিতে হামলাকারীদের এই ঔদ্ধত্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও আইনের প্রয়োগব্যবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার শামিল। সরকারি বাহিনীর সদস্যের হাত ধরে থাকা অবস্থায় একজন নাগরিক যদি এমন হামলার শিকার হন, তবে তা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের ওপর আস্থার সংকট তৈরি করে। জাকিয়া সুলতানার দাবি অনুযায়ী, তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাজারো নারীর জীবিকা জড়িত।
এই ধরনের হামলার ফলে স্থানীয় নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নেতিবাচক। নারী উদ্যোক্তারা যখন ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন এ ধরনের সহিংসতা তাঁদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার একটি অপপ্রয়াস হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। রাজবাড়ীর এই ঘটনায় ইতিমধ্যে কয়েকজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল এখন প্রত্যাশা করছে যে, অপরাধীরা যেন কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবে পার পেয়ে না যায়। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। পুলিশের উপস্থিতিতে এই হামলার ঘটনার পর থেকে স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে যখন কোনো নাগরিক পুলিশের হেফাজতে থাকেন। সেই হেফাজতে থাকা অবস্থায় হামলার ঘটনাটি পুলিশের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করাই এখন প্রধান দাবি।
