রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলন্ত রিকশা বা অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টান দেওয়ার ঘটনায় গত ছয় মাসে অন্তত তিন নারীর মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট সকালে বগুড়া থেকে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা ৫৭ বছর বয়সী রনজিলা পারভীন সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। রিকশায় থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি চলন্ত রিকশা থেকে সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন।
পরবর্তীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে রাজধানীর উত্তরায় মুক্তা আক্তার এবং গত জুন মাসে একই হাসপাতালে সামনে সোহেলি ইসলাম একইভাবে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারান। সোহেলি ইসলাম একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা ছিলেন এবং কর্মস্থলে ফেরার পথে তিনি এই দুর্ঘটনার শিকার হন।
ছিনতাইয়ের এই প্রবণতা এখন রাজধানীর সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তার ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছিনতাইকারীরা সাধারণত চলন্ত যানবাহনের পাশ বা পেছন থেকে ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়, যার ফলে ভুক্তভোগীরা ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। এই ধরনের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয় বরং রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকা ও মোড়ে নিয়মিত ঘটছে।
তবে ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ থানায় মামলা করতে আগ্রহী হন না। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায় গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি গ্রহণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র পুলিশের অপরাধের নথিতে উঠে আসছে না। গত ৩০ আগস্ট ধানমন্ডি লেক এলাকায় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফেরার পথে ৩৯ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের একটি বড় ঘটনা ঘটে।
মোটরসাইকেলে আসা তিনজন ব্যক্তি অস্ত্র দেখিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা তাদের ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে মোটরসাইকেল থেকে একজন পড়ে গেলে স্থানীয়রা তাকে পিস্তলসহ আটক করেন। পরবর্তীতে ধানমন্ডি থানা পুলিশ তানভীর আবেদীন জুইসহ তিনজনকে আটক করে। এই ঘটনার মাধ্যমে রাজধানীতে সশস্ত্র ছিনতাইয়ের ভয়াবহতা আবারও সামনে এসেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীতে দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৪৯টি এবং ডাকাতির মামলা হয়েছে ১৮টি। তবে এই পরিসংখ্যান ছিনতাইয়ের প্রকৃত ঘটনার তুলনায় অনেক কম। গত ছয় মাসে অন্তত ২২টি আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীদের কুপিয়ে, ছুরিকাঘাত করে বা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সম্পদ লুট করা হয়েছে।
এসব ঘটনার মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ধারালো অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ছিনতাইয়ের সময় ও স্থান পরিবর্তনের প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে ছিনতাই মূলত ভোর বা গভীর রাতে হতো, কিন্তু এখন দিনদুপুরেও ব্যস্ত এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোর থেকে সকাল ৯টা এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
সকালের দিকে রিকশা বা অটোরিকশার যাত্রী এবং ব্যবসায়িক কাজে নগদ টাকা বহনকারী ব্যক্তিরা বেশি লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। ছিনতাই প্রতিরোধে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ৮৮টি চেকপোস্ট কাজ করছে এবং প্রতিটি থানায় নিয়মিত টহল দল সক্রিয় রয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, ভুক্তভোগীরা এজাহার নিয়ে থানায় এলে অবশ্যই মামলা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের মামলার সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। তবে পুলিশের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ফিরে না আসায় এবং অপরাধের প্রকৃত হিসাব নথিবদ্ধ না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েই গেছে। ছিনতাইয়ের এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।
