যশোরের চৌগাছায় গ্রেফতারের পর বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলি করার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশের এক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই)। মঙ্গলবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারিক প্যানেলে তিনি এই জবানবন্দি পেশ করেন। রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া ওই পুলিশ সদস্য বর্তমানে সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানায় কর্মরত রয়েছেন।
নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি যশোরের চৌগাছা থানায় কর্মরত ছিলেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট সাংগঠনিক কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে ছাত্রশিবিরের তৎকালীন জেলা পশ্চিম চৌগাছা উপজেলার সাহিত্য সম্পাদক মো. রুহুল আমিন এবং থানা সেক্রেটারি ইস্রাফিল হোসেনকে বন্দুলিতলা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এরপর ৪ আগস্ট তাদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের পর থানায় ফিরিয়ে আনার পথে কয়ারপাড়া এলাকায় তাদের হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। গভীর রাতে তাদের বন্দুলিতলার নির্জন মাঠে নিয়ে হাঁটুতে গুলি করা হয়। পরে তাদের উপজেলা সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে যশোর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।
অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাদের ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে সাতদিন চিকিৎসার পর পায়ে পচন ধরলে চিকিৎসকরা তাদের পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পা কেটে ফেলা হয়। ঘটনার পর পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয় যে, বন্দুকযুদ্ধে ওই দুই নেতা আহত হয়েছেন।
তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা দায়ের করে দুই মাস চিকিৎসার পর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। জবানবন্দিতে সাক্ষী জানান, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট দুপুরে তিনিসহ পুলিশের একটি দল নারায়ণপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসান। সেখানে মোটরসাইকেলে আসা ইস্রাফিল ও রুহুল আমীনকে থামিয়ে তল্লাশি করা হয়। তাদের কাছে ছাত্রশিবিরের চাঁদা আদায়ের রসিদ ও রেজিস্টার পাওয়া যায়।
এএসআই মুখলেছুজ্জামানের মাধ্যমে চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসিকে বিষয়টি জানানো হলে তাদের থানায় নিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। সাক্ষী জানান, থানায় তাদের ডিউটি অফিসারের রুমে রেখে তিনি বাসায় চলে যান। ৫ আগস্ট থানায় এসে তিনি জানতে পারেন যে, গ্রেফতারকৃতদের পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সাক্ষী দাবি করেন, ওই গুলিগুলো কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হক করেছিলেন। এএসআই মুখলেছুজ্জামান বাদী হয়ে ওই মামলা দায়ের করেন। সাক্ষী আরও জানান, ওই সাজানো মামলায় তাকে আহত হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে তিনি চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। অথচ ওই ঘটনায় তিনি মোটেও আহত হননি এবং ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন।
এ বিষয়ে এএসআই মুখলেছুজ্জামানকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান এবং ওসি মশিউর রহমান সব বিষয়ে অবগত আছেন এবং তাকে নীরব থাকতে বলা হয়। পরবর্তীতে এসআই জামাল ওই মামলায় তাকে সাক্ষী হিসেবে দেখিয়ে চার্জশিট দাখিল করেন। এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মোট আটজন আসামি রয়েছেন।
তারা হলেন তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল, এসআই মাজেদুল, তৎকালীন উপ-পরিদর্শক আতিকুল ইসলাম এবং কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও জহরুল হক। এর মধ্যে আতিকুল ইসলাম, সাজ্জাদুর রহমান ও জহরুল হক বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম ও আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যান্য প্রসিকিউটররা শুনানিতে অংশ নেন।
