ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নে ৪৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। ভাওয়াল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান তাসলিমা আক্তার ময়মনসিংহ-১১ আসনের সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কৃষিজমি ও বসতভিটা ধ্বংস করে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রস্তাবিত নন্দীপাড়া ও ঝালপাজা মৌজার ১৭৩ দশমিক ১৩ একর জমির প্রকৃতি নিয়ে কৃষি বিভাগ প্রথমে আপত্তি জানালেও পরবর্তীতে চাপের মুখে অনাপত্তিপত্র প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য দরপত্র আহ্বান করলে এই প্রকল্পটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
প্রকল্পের জন্য জমি যাচাই করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রস্তাবিত জমির একটি বড় অংশ কৃষিজমি, যেখানে স্থানীয় কৃষকেরা নিয়মিত বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করেন। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় প্রায় ১৪০ একরের মতো চাষাবাদযোগ্য জমি রয়েছে।
এছাড়া সেখানে মানুষের বসতবাড়ি ও গাছপালাও বিদ্যমান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক মো. এনামুল হক জানান, প্রস্তাবিত জমির মধ্যে এক ফসলি ও দুই ফসলি জমি রয়েছে। তিনি স্বীকার করেন যে, স্থানীয় ও ওপর মহলের চাপের মুখে কৃষি বিভাগ অনাপত্তিপত্র দিতে বাধ্য হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামানও একই ধরনের চাপের কথা উল্লেখ করে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছিল যেন কৃষিজমিকে অকৃষি হিসেবে দেখানো হয়।
যদিও সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ তার বা তার অনুসারীদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার চাপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, প্রস্তাবিত জমির একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র এক ফসলি এবং বাকি জমি অকৃষি। তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল ম্যাপ ও সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতেই জমির প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য ভিন্ন। ঝালপাজা ও নন্দীপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা বংশপরম্পরায় এই জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ও রিটন মণ্ডল জানান, তারা কোনোভাবেই তাদের ফসলি জমি ও বসতভিটা ছাড়তে রাজি নন। জমি হারানোর শঙ্কায় গত ৯ আগস্ট স্থানীয় কৃষকেরা ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন।
এদিকে, এই প্রকল্পের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলার সময় এমপির অনুসারী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। তারা সাংবাদিকদের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফিরোজ হোসেন দাবি করেছেন যে, প্রশাসন সতর্কতার সাথে বিষয়টি যাচাই করছে।
তিনি জানান, কিছু এক ফসলি ও মাছ চাষের জমি বাদ দিয়ে সংশোধিত শিডিউল জমা দেওয়া হয়েছে। তবে উপজেলা কৃষি দপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, এখনো বড় একটি অংশ কৃষিজমির অন্তর্ভুক্ত। ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, ফসলি জমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। অথচ শিল্পায়নের ফলে ভালুকায় ধারাবাহিকভাবে কৃষিজমি কমছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে ময়মনসিংহে ৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর আবাদি জমি হ্রাস পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে আবাদি জমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান দরপত্রে নির্বাচিত হলে জমির মালিকদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে জমি সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে।
তবে স্থানীয়রা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা তাদের কৃষি জমি কোনোভাবেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দিতে ইচ্ছুক নন। পুরো বিষয়টি এখন স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, যেখানে একদিকে উন্নয়নের দাবি এবং অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকদের অধিকারের বিষয়টি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
