ময়মনসিংহের গফরগাঁও পৌর এলাকার শিলাসী গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল আলম ওরফে রবিন হত্যাকাণ্ডের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনো মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। গত ৮ জুন দিবাগত রাতে নিজের ২৩তম জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলায় আশরাফুল নিহত হন। এই ঘটনায় নিহতের বাবা মোফাজ্জল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করলেও এখন পর্যন্ত তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মামলার তদন্তের বর্তমান অবস্থা নিয়ে নিহতের পরিবার গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। নিহতের মা শান্তা আক্তার জানান, ঘটনার পর থেকে তারা নিয়মিত থানায় যোগাযোগ করছেন, কিন্তু পুলিশ কেবল তদন্ত চলমান থাকার কথা বলে আসছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ৮ জুন রাত ১২টা ১ মিনিটে গফরগাঁও ডাকবাংলো চত্বরে বন্ধুদের সঙ্গে নিজের জন্মদিনের কেক কাটেন আশরাফুল।
অনুষ্ঠান শেষে রাত পৌনে একটার দিকে বন্ধু শাকিবুল হাসানের মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফেরার পথে শিলাসী মাজার রোড এলাকায় একদল দুর্বৃত্ত তাদের গতিরোধ করে। দুর্বৃত্তরা আশরাফুলের চোখেমুখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দেয়। এ সময় শাকিবুল পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও দুর্বৃত্তরা আশরাফুলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করে।
হামলায় আশরাফুলের বাঁ হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সোয়া তিনটার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার দুই দিন পর ১০ জুন আশরাফুলের বাবা মোফাজ্জল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় মামলা করেন।
পুলিশ এরপর সন্দেহভাজন হিসেবে মো. রাজিব নামের একজনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে এবং তাকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে রিমান্ডে রাজিবের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। নিহতের বাবা মোফাজ্জল হোসেনের দাবি, ২০২১ সালে স্থানীয় একটি ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে রাজিবের সঙ্গে আশরাফুলের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল।
সেই পুরোনো শত্রুতার জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি তার একমাত্র সন্তানের হত্যাকারীদের দ্রুত শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। ঘটনার সময় আশরাফুলের সঙ্গে থাকা বন্ধু শাকিবুল হাসান বর্তমানে বাড়িতে নেই। শাকিবুলের বাবা আবদুল মতিন জানান, পারিবারিক কলহের জেরে শাকিবুল চার দিন আগে বাড়ি থেকে চলে গেছে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গফরগাঁও সার্কেল) মনতোষ বিশ্বাস জানিয়েছেন, পুলিশ অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ করছে। তিনি বলেন, সন্দেহভাজন রাজিবকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, কিন্তু তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্যই এখন প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রাজিবের সঙ্গে আশরাফুলের পূর্ববিরোধের বিষয়টি পুলিশ খতিয়ে দেখছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে পারলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও মূল আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্থানীয় ছাত্র-জনতা বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। নিহতের পরিবার এখন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছে।
