মালয়েশিয়ার সাবাহ প্রদেশে আয়োজিত ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অংশীদারত্ব সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন ড. সাইমুম পারভেজ। এশিয়া ইন্ডিজেনাস পিপলস প্যাক্ট বা এআইপিপি আয়োজিত এই সম্মেলনের ‘সরকার, জাতিসংঘ সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সংলাপ’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন। সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।
এই অধিবেশনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ড. সাইমুম পারভেজ তার আলোচনায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার ও তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাসের অঞ্চলগুলোর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কেবল একটি পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, বরং এটি তাদের ভূমি, জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের যেকোনো পরিকল্পনা গ্রহণ বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামত, তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি আরও বলেন, যুগ যুগ ধরে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখে বসবাস করে আসা এসব জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক চর্চা রয়েছে।
পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তাদের এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের যেকোনো উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ও টেকসই করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। ড. সাইমুম পারভেজ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কার্যক্রমের কেবল সুবিধাভোগী হিসেবে না দেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনার ওপর জোর দেন।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তাদের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষিত রাখা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। কাউকে পেছনে রেখে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব নয়। ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় জাতিগত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় দেশের সম্মিলিত শক্তির অংশ।
এই বৈচিত্র্যকে সম্মান ও সংরক্ষণ করেই জাতীয় ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, দেশের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজ ভূমি ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত থাকার পাশাপাশি তাদের শিকড়, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বতন্ত্র পরিচয়ও যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষিত হবে।
পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়বিচার ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্য দিয়েই সব জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিনিধিরাও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার ও টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে এই সম্মেলনে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
