মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আপন বড় ভাইয়ের পা কেটে পঙ্গু করে দেওয়া এবং পরবর্তীতে তার ভাতিজাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে সিদ্দিক মোল্লা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি জামিনে মুক্তি পেয়ে নিহতের পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছেন বলে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিহতের স্ত্রী লিপি বেগম এসব তথ্য তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে হামলায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া ইসহাক মোল্লাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। লিপি বেগম জানান, সিরাজদিখানের কোলা ইউনিয়নের পূর্ব কোলাগ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিক মোল্লা ও তার পরিবারের সাথে ইসহাক মোল্লার দীর্ঘদিনের জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিল।
এই বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ৮ মার্চ সিদ্দিক মোল্লা ও তার সহযোগীরা ইসহাক মোল্লার ওপর হামলা চালান। অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্রের সাহায্যে ইসহাকের ডান পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন, যার ফলে তিনি স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যান। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ওই ঘটনায় মামলা দায়ের করা হলেও আসামিদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
লিপি বেগম অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে মামলার মূল আসামিদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। ইসহাক মোল্লার ওপর হামলার ঘটনার প্রায় এক বছর পর ২০২৬ সালের ১৯ জুন একই বিরোধের জেরে ইলিয়াস মোল্লাকে হত্যা করা হয়। লিপি বেগম জানান, মালয়েশিয়া প্রবাসী ইলিয়াস মোল্লা দেশে ফিরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করছিলেন।
ঘটনার দিন ইলিয়াস তার পঙ্গু চাচা ইসহাক মোল্লাকে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে যাওয়ার সময় সিদ্দিক মোল্লা, তার স্ত্রী রওশন আরা এবং দুই ছেলে বিপ্লব মোল্লা ও বিদ্যুৎ মোল্লা অতর্কিতে হামলা চালান। হামলাকারীরা রামদা দিয়ে ইলিয়াসকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। একই সময় হুইলচেয়ারে থাকা ইসহাক মোল্লাকেও কুপিয়ে তার ডান হাতের দুটি আঙুল বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
স্থানীয়রা এগিয়ে আসতে চাইলে হামলাকারীরা অস্ত্র প্রদর্শন করে তাদের ভয়ভীতি দেখান। গুরুতর আহত অবস্থায় ইলিয়াস ও ইসহাককে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ইলিয়াসকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুন তিনি মারা যান।
এই ঘটনায় সিরাজদিখান থানায় মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ বিপ্লব মোল্লা, বিদ্যুৎ মোল্লা, সিদ্দিক মোল্লা ও রওশন আরাকে গ্রেফতার করে। লিপি বেগমের দাবি অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃতরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে গ্রেফতারের প্রায় এক মাসের মাথায় রওশন আরা জামিনে মুক্তি পান। লিপি বেগম অভিযোগ করেন, জামিনে বেরিয়ে আসার পর থেকেই রওশন আরা তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নিয়মিত হুমকি দিচ্ছেন।
মামলা প্রত্যাহার না করলে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয় যে, সিদ্দিক মোল্লা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে এক গৃহকর্মীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এবং আসিফ নামের এক যুবককে হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
লিপি বেগম জানান, অভিযুক্তরা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তোয়াক্কা করেন না। ভুক্তভোগী পরিবারটি পুলিশের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া হলে অভিযুক্তরা আরও বড় ধরনের অপরাধ ঘটাতে পারেন।
লিপি বেগম বলেন, আমরা স্বামী হত্যার বিচার চাই এবং পুলিশ যেন কোনো ধরনের প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার না করে সঠিক চার্জশিট আদালতে জমা দেয়।
