কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যে মানবতার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত হন। গত ১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সারেঙ সংস্কৃতি কেন্দ্র আয়োজিত ‘তবু আমারে দেব না ভুলিতে’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নজরুল গবেষক ও সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, বাংলা সাহিত্যে মানবতার পক্ষে এবং শোষণের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো এত শব্দ ও আকুলতা আর কেউ প্রকাশ করেননি।
তিনি উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রের সংহতি ও ঐক্যের জন্য যেমন একটি মজবুত ভিত্তি প্রয়োজন, তেমনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রেও নজরুলের আদর্শ ও দর্শন অপরিহার্য। কবি আবদুল হাই শিকদার আরও বলেন, স্বাধীনতার পক্ষে সবচেয়ে শিল্পসম্মত শব্দ চয়ন করেছেন নজরুল। তিনি তরুণ প্রজন্মকে নজরুলের সাহিত্য ও আদর্শ ধারণ করে একটি শিল্প-সাহিত্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে কবি নজরুলকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ নায়ক হিসেবে অভিহিত করা হয়। বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন যে, তৎকালীন সময়ে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তরুণ নজরুলকে সভামঞ্চে নিজের পাশে বসিয়ে সম্মান জানিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গবেষক ও শিল্পপতি আবুল কাসেম হায়দার বলেন, নজরুলের কবিতা ও গান আমাদের জাতীয় সম্পদ।
তিনি নজরুলের সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, কারণ তাঁর সৃষ্টিকর্মের আবেদন বিশ্বজনীন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামান বলেন, কবি নজরুল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক বিস্ময়। তিনি আরও বলেন, নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে পাওয়া আমাদের জন্য গৌরবের বিষয়।
আমাদের জাতীয় চেতনার ধারক নজরুলকে যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্য নজরুল বর্ষকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন গণঅভ্যুত্থানে নজরুলের কালজয়ী গান ও কবিতা প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা আমাদের পথ দেখাবে। সারেঙ সংস্কৃতি কেন্দ্রের সম্পাদক আবদুর রহমান মল্লিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক জয়শ্রী দাস, লালন গবেষক হীরক রাজা, অধ্যাপক জাহানারা হক, শিশুসাহিত্যিক মামুন সরোয়ার এবং সাহিত্য সংগঠক শামসুল হক বাবুসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, নজরুলের সাহিত্য কেবল পাঠের বিষয় নয়, বরং তা আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি সংকট ও অর্জনে দিকনির্দেশনা প্রদান করে। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান বর্তমান প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টজনরা নজরুল চর্চা বাড়ানোর ওপর জোর দেন এবং তাঁর সৃষ্টিকর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।
সবশেষে বক্তারা নজরুল বর্ষকে কেন্দ্র করে বছরব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যাতে নজরুলের আদর্শ ও দর্শন নতুন প্রজন্মের মাঝে আরও গভীরভাবে প্রোথিত হয়।
