জাতীয়বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী আজ ৫ সেপ্টেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ লড়াইয়ে তিনি শহীদ হন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানিয়েছে, নূর মোহাম্মদ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল।
তবে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে তিনি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ২৩ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআরে যোগদান করেন। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে ওই বছর ৩ ডিসেম্বর তিনি দিনাজপুর সেক্টরের কুঠিবাড়ি ক্যাম্পে সৈনিক হিসেবে নিযুক্ত হন। সৈনিক জীবনে তার উচ্ছলতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি সবার প্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে তাকে ইপিআরের যশোর সেক্টর সদর দপ্তরে বদলি করা হয়।
২৫ মার্চের গণহত্যার সময় নূর মোহাম্মদ নিয়মিত ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার খবর জানতে পেরে তিনি ছুটি শেষ হওয়ার আগেই নিজ কর্মস্থল ৪ নম্বর ইপিআর উইংয়ে যোগদান করেন। ওই সময় ৪ নম্বর উইং ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে যশোর এলাকায় অবস্থান করছিল। আগস্ট মাসে ৮ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশে সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা তার অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে গেরিলা যুদ্ধের জন্য বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেন।
ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন একটি দল আগস্ট মাসের শুরুতেই যশোরের চৌগাছা থানার ছুটিপুর গ্রামে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নেয়। ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ এই দলের সদস্য ছিলেন।
ছুটিপুর গ্রামটি যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী সদর দপ্তর ছিল যশোর ক্যান্টনমেন্ট। আগস্টের আগে এই এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানিদের বহুবার সংঘর্ষ হয়। এতে পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রতিবারই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। তবে কৌশলগত গুরুত্বের কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছুটিপুর এলাকাটি দখলের জন্য বারবার আক্রমণ করে আসছিল।
৫ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ চারজন সহযোদ্ধাসহ গোয়ালহাটি গ্রামের কাছে টহল ডিউটিতে ছিলেন। তিনি ছিলেন ওই টহলের অধিনায়ক। তার দায়িত্ব ছিল শত্রুর ওপর দৃষ্টি রাখা এবং তাদের আক্রমণের পরিকল্পনা প্রতিরক্ষা অবস্থানে পাঠানোর কথা জানানো। এই সময় শত্রুপক্ষ তিন দিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে এবং বিরামহীন গুলিবর্ষণ শুরু করে।
প্রচণ্ড গোলাগুলিতে নূর মোহাম্মদের সহযোদ্ধা সিপাহি নান্নু মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। দলের অধিনায়ক হিসেবে নূর মোহাম্মদ দ্রুত আহত নান্নু মিয়ার দিকে এগিয়ে যান এবং তার এলএমজি দিয়ে শত্রুর দিকে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। এতে শত্রুর অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। নূর মোহাম্মদ তার অধীনস্থ সৈনিকদের বারবার অবস্থান পরিবর্তন করে গুলি ছুড়তে নির্দেশ দেন যাতে শত্রুপক্ষ তাদের সঠিক অবস্থান বুঝতে না পারে।
অবস্থান পরিবর্তনের সময় নূর মোহাম্মদ আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। এসময় তার ডান কাঁধে গুলি লাগে এবং ২ ইঞ্চি মর্টার শেলের আঘাতে তার ডান হাঁটু ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। এই অবস্থায় তিনি সহযোদ্ধা সিপাহি মোস্তফাকে নির্দেশ দেন আহত নান্নু মিয়াসহ সবাইকে নিরাপদ স্থানে ফিরে যেতে।
শত্রুপক্ষ আরও কাছাকাছি চলে আসায় নূর মোহাম্মদের সামনে পিছু হটা অথবা সরাসরি মোকাবিলা করার পথ খোলা ছিল। তবে রক্তক্ষরণের কারণে তিনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। সিপাহি মোস্তফা তাকে ধরে তুলতে চাইলেও নূর মোহাম্মদ পাশের একটি গাছের গুঁড়ি আঁকড়ে ধরে বলেন যে আহত নান্নু মিয়া ও এলএমজিটি নিয়ে সবাই নিরাপদ স্থানে ফিরে যাক, নতুবা সবাই মারা যাবে এবং প্রতিরক্ষা অবস্থানটিও হুমকির মুখে পড়বে।
ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ এই অনড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সিপাহি মোস্তফা তার এসএলআরটি নূর মোহাম্মদের হাতে দিয়ে বাকিদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে ফিরে যান। নূর মোহাম্মদ তার আঘাতপ্রাপ্ত দেহ টেনে নিয়ে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করে শত্রুদলের দিকে গুলি ছুড়তে থাকেন। সহযোদ্ধারা নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে গেলে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।
তবে মারাত্মক আহত অবস্থায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তিনি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। গুলিবর্ষণ কমে যেতে দেখে পাকিস্তানিরা অগ্রসর হয় এবং মৃতপ্রায় নূর মোহাম্মদকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। প্রায় এক ঘণ্টা পর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল আক্রমণ করে হানাদার বাহিনীকে পিছু হঠাতে সক্ষম হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা নূর মোহাম্মদের নিথর দেহটি ঝোপের আড়ালে দেখতে পান।
তার চোখ দুটি উপড়ানো ছিল এবং পুরো শরীর বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ছিল। তার মরদেহ যশোরের শার্শা থানার কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশ সরকার তার এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে।
