নারায়ণগঞ্জ জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। জেলার শহর এলাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন থানা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসার জন্য ভিড় করছেন। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে জেলায় মোট ৭১০ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন।
এর মধ্যে ১২৭ জন বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত জেলায় নতুন করে আরও ১৪৬ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৪১ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দর উপজেলায় আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি।
আগস্ট মাসে সদর উপজেলায় ২৫০ জন এবং বন্দর উপজেলায় ২৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এছাড়া সোনারগাঁ উপজেলায় ১০০ জন, আড়াইহাজারে ৫৩ জন এবং রূপগঞ্জ উপজেলায় ৪৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাস পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু আগস্ট মাসে সেই সংখ্যা সাত শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও রোগীর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যদিও নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই, তবে জেলা থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ মারজানুর রহমান জানিয়েছেন, রূপগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের চেইনম্যান আবু ছিদ্দিক ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত ২৮ আগস্ট সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাকান্দা চৌধুরীপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশা বেগম ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাকে প্রথমে খানপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর মৌসুম হওয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।
নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাশার জানান, হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ রয়েছে। তিনি রোগীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, সঠিক চিকিৎসা নিলে রোগীরা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। তার মতে, প্রায় ৯০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হতে পারেন।
তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস এম সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বাড়লেও স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিশেষ নজর রয়েছে এবং জনগণের সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন গড়ে অর্ধশতাধিক নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচতে মশা নিধন এবং বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার কোনো বিকল্প নেই। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
