নাটোর শহরের রথবাড়ি রাজাপুর মহল্লার বাসিন্দা ইউনুস আলী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কোয়েল পাখি বিক্রির মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণ করছেন। তিনি প্রতি রোববার নাটোর শহরের তেবাড়িয়া হাটে এবং সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে শহরের নিচাবাজারে পাখি বিক্রি করেন। আট বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি ও চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়েছেন।
বর্তমানে তিনি তাঁর বৃদ্ধা মা ও বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া বোনের সংসার চালানোর দায়িত্ব পালন করছেন।
ইউনুস আলীর এই শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি যখন শহরের শের-ই-বাংলা স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তেন, তখন হঠাৎ জ্বর ও পেটের ব্যথার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসার সময় জটিলতা দেখা দেয় এবং তিনি তাঁর দুই চোখের দৃষ্টি ও দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে তাঁর উন্নত চিকিৎসা সম্ভব হয়নি, যার ফলে তাঁর পড়াশোনা ও খেলাধুলা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবারের আর্থিক সংকট ও বাবার অনুপস্থিতিতে ইউনুস আলীকে অল্প বয়সেই বড় দায়িত্ব নিতে হয়। প্রতিবন্ধী ভাতা হিসেবে তিনি প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা পেতেন, যা দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল না। একজন খামারের পরামর্শে তিনি তাঁর ভাতার টাকা দিয়ে ৮০টি কোয়েল পাখি কিনে ব্যবসা শুরু করেন।
ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসার পরিধি বাড়ে এবং তিনি 'ইউনুস কোয়েল ফার্ম' গড়ে তোলেন। খামারিরা তাঁকে নিয়মিত পাখি সরবরাহ করেন এবং তিনি তা বাজারে বিক্রি করেন।
দৃষ্টিহীনতা ও শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও ইউনুস আলী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাখি জবাই ও পরিষ্কার করার কাজ সম্পন্ন করেন। তবে এই পেশায় তাঁকে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়। স্বল্প পুঁজি, হিসাব রাখা ও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁকে বেগ পেতে হয়। এছাড়া বাজারের নির্দিষ্ট জায়গা না থাকা এবং যাতায়াতের সমস্যার কারণে তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
দৃষ্টিহীনতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ক্রেতা তাঁকে কম টাকা দিয়ে বা জাল টাকা দিয়ে প্রতারিত করার চেষ্টাও করেন।
গত শীতে ইউনুসের ব্যবসায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে যখন তাঁর কাছে থাকা এক হাজার পাখির মৃত্যু ঘটে। এই পরিস্থিতিতে নাটোর পৌরসভার সাবেক মেয়র এমদাদুল হক আল মামুন তাঁকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে সহায়তা করেন। এই অর্থ দিয়ে তিনি পুনরায় পাখি সংগ্রহ করে ব্যবসা শুরু করতে সক্ষম হন।
ইউনুস আলীর বোন রিনি খাতুন জানিয়েছেন, তাঁর ভাই তাঁকে আশ্রয় ও ভরণপোষণ দিয়ে সাহায্য করছেন। ইউনুসের মা রাজিয়া বেগম তাঁর ছেলের পরিশ্রম ও দায়িত্বশীলতার প্রশংসা করেছেন। স্থানীয় ক্রেতারা ইউনুস আলীকে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী হিসেবে গণ্য করেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ইউনুস খুব কম লাভে পাখি বিক্রি করেন এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজ করেন, যার ফলে তাঁরা নিয়মিত তাঁর কাছ থেকে পাখি কেনেন।
ইউনুস আলী তাঁর ব্যবসার উন্নতির জন্য কিছু নির্দিষ্ট সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ব্যবসার জন্য বাজারে একটি স্থায়ী জায়গা এবং যাতায়াতের জন্য একটি যানবাহন পেলে তাঁর কাজ আরও সহজ হতো। বর্তমানে তিনি মাছ বাজারের নির্দিষ্ট সময়ের পর দোকান দেওয়ার সুযোগ পান, যা তাঁর বেচাকেনার ওপর প্রভাব ফেলে।
