সারা দেশে শিশু ধর্ষণের মামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শিশু ধর্ষণের ১ হাজার ৪৮৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৯৯৮টি। সেই হিসেবে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর শিশু ধর্ষণের মামলা প্রায় ৪৯ শতাংশ বেড়েছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসে এই সংখ্যা ছিল ৭৫১টি, যা থেকে বর্তমান পরিসংখ্যান প্রায় ৯৮ শতাংশ বেশি। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মোট ১২ হাজার ৪৪৬টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ২৫টি মামলা হয়েছে ধর্ষণের অভিযোগে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ধর্ষণ, যৌন পীড়ন, অপহরণ, যৌতুক এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনাসহ মোট নয়টি অপরাধের বিচার করা হয়। পুলিশের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, শিশু ধর্ষণের ঘটনার একটি বড় অংশ পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক লোকলজ্জার ভয়, চাপ বা হুমকির কারণে পরিবারগুলো ঘটনা গোপন রাখার চেষ্টা করে অথবা অভিযোগ করতে দেরি করে।
এতে তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, ভুক্তভোগীবান্ধব পরিবেশে সাক্ষ্য গ্রহণ এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সম্মিলিত সচেতনতা ছাড়া এ ধরনের অপরাধ কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব নয়।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি এই পরিস্থিতির একটি উদাহরণ। মামলার এজাহার অনুযায়ী, বিস্কুট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটিকে একটি পরিত্যক্ত স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। পরবর্তীতে ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে তাকে বারবার নির্যাতন করা হয়।
গত ১৮ জুন শিশুটি চিৎকার করে বাড়ি ফিরে ঘটনাটি জানালে তার মা মামলা করেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। আসামির পরিবার সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য চাপ দিচ্ছে এবং টাকার প্রলোভন দেখাচ্ছে। গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, আসামি পলাতক রয়েছেন এবং তার ব্যবহৃত মুঠোফোনটি জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ধর্ষণের মামলা আপসযোগ্য নয়। অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞ উমর ফারুকের মতে, শিশু ধর্ষণের ঘটনা বর্তমানে নাগরিক জীবনে চরম উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি মনে করেন, ধর্ষণের পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে মামলাগুলো যথাযথভাবে পরিচালনা করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এছাড়া পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মূল্যবোধের শিক্ষা এবং নারীর প্রতি মর্যাদাশীল আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৩৬৫টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।
গত কয়েক বছরে বেশ কিছু আলোচিত মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হয়েছে। নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মাদ্রাসাশিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া মাগুরায় শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালও পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত রায় কার্যকর করা গেলে অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পেতে পারে।
