সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব কবীর মিলন। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, অসৎ কর্মকর্তাদের বেতন মাসে দশ লাখ টাকা করা হলেও তারা অনৈতিক উপার্জন বা ঘুষ গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে না।
তার মতে, দুর্নীতিবাজদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে সততা আশা করা একটি হাস্যকর ধারণা। তিনি উল্লেখ করেন, একমাত্র মৃত্যু অথবা চাকরি থেকে অবসরের দিন অফিস শেষে বাসায় ফেরার পরই কেবল একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ঘুষ গ্রহণের প্রবণতা বন্ধ হয়। তবে তিনি এও বলেন যে, রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে থাকা সৎ কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সময়ে সময়ে বেতন বাড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
মাহবুব কবীর মিলন জানান, সরকারি চাকরিতে থাকা সৎ কর্মকর্তাদের সংখ্যা খুবই কম, যা মোট কর্মীবাহিনীর মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ হতে পারে। এই স্বল্প সংখ্যক সৎ মানুষের অন্তত স্বস্তিতে জীবন-যাপনের সুযোগ তৈরি করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। তিনি যুক্তি দেন যে, যদি একজন সৎ মানুষের উপকারের জন্য নিরানব্বই জন অসৎ ব্যক্তির কিছু বাড়তি সুবিধা হয়, তবুও রাষ্ট্রের উচিত সৎ কর্মকর্তাদের কথা বিবেচনা করা।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে অনেক কর্মকর্তাকে তিনি দেখেছেন যাদের প্রতিদিনের ঘুষের পরিমাণ ছিল গড়ে পাঁচ কোটি টাকা এবং অনেকের ক্ষেত্রে তা প্রতিদিন এক কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাত। তিনি আরও বলেন, দাপ্তরিক কাজের অটোমেশন বা দপ্তর পরিবর্তনের কারণে ঘুষের সুযোগ কমে গেলে অসৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
তিনি ট্রেনে ভ্রমণকালীন দুই কর্মকর্তার সাথে কথোপকথনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঘুষের সুযোগ কমে যাওয়ায় তাদের মন খারাপ ছিল, যদিও তাদের বেতন এবং অন্যান্য উপরি আয় তখনও চলমান ছিল। তিনি মনে করেন, বেতন বৃদ্ধি করলে সৎ মানুষগুলো কিছুটা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে এবং তাদের উপকারের জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি দূর করা বা অসৎ মানুষকে সৎ বানানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি মন্তব্য করেন যে, সমাজে মিথ্যাচার, দুর্নীতি, অন্যের হক নষ্ট করা, খাদ্যে ভেজাল, হিংসা এবং উগ্রতার মতো নেতিবাচক প্রবণতা ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। তার মতে, ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি সৎ ও কর্মশীল হওয়া জরুরি।
তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে, এই দেশ থেকে দুর্নীতি কেয়ামত বা শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত দূর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই দুর্নীতি নির্মূলের আশায় বসে না থেকে সৎ কর্মকর্তাদের সুরক্ষার জন্য বেতন বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপগুলো নিয়মিত বিরতিতে নেওয়া উচিত। তার এই বক্তব্য সরকারি চাকরিতে দুর্নীতি এবং বেতন কাঠামোর প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দুর্নীতিবাজদের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য বেতন বৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়, বরং এটি কেবল সৎ কর্মকর্তাদের টিকে থাকার একটি উপায় মাত্র।
