ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য একটি দায়িত্ব। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা ফরজ বলে গণ্য করা হয়। তবে এই জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে সঠিক উৎস এবং যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, দ্বীনি জ্ঞান কেবল অসংলগ্ন পর্যবেক্ষণ বা সাধারণ তথ্যের সমাহার নয়, বরং এটি একটি বিশেষ নূর বা আলো যা মানুষের অন্তরে প্রশান্তি ও হেদায়েত নিয়ে আসে। দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের সঠিক পদ্ধতি হলো নির্ভরযোগ্য কিতাব অধ্যয়ন করা এবং বিজ্ঞ আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে সরাসরি শিক্ষা গ্রহণ করা।
কোনো ব্যক্তি বা বক্তাকে শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করার আগে তার ইলমি অবস্থান এবং দ্বীনি আমল সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়া জরুরি। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ. ) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন যে, এই ইলম বা জ্ঞানই হলো মানুষের দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা। তাই জ্ঞান গ্রহণ করার আগে তা কার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা প্রতিটি মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব।
নির্ভরযোগ্য আলেমদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ ভুল বা অযোগ্য ব্যক্তির কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান মানুষকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা. ) এক হাদিসে সতর্ক করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা পৃথিবী থেকে আলেমদের তুলে নেওয়ার মাধ্যমে জ্ঞান উঠিয়ে নেবেন। যখন কোনো প্রকৃত আলেম অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মানুষ মূর্খদের নিজেদের নেতা বানিয়ে নেবে।
এই মূর্খরা কোনো সঠিক জ্ঞান ছাড়াই ফতোয়া প্রদান করবে, যার ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরও বিপথগামী করবে। তাই হালাল ও হারামের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই যোগ্য ও প্রকৃত আলেমদের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে আমলের গুরুত্বও সমানভাবে বিদ্যমান।
যাদের ব্যক্তিগত জীবনে দ্বীনি অনুশীলন বা আমল নেই, তাদের কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইসলামি দর্শনে জ্ঞানকে একটি আলোর সাথে তুলনা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যখন পাপাচারে লিপ্ত হয়, তখন তার অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়, যা জ্ঞানের আলোকে বাধাগ্রস্ত করে।
ফলে সেই জ্ঞান আর অন্তরে প্রকৃত প্রভাব ফেলতে পারে না। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মতে, কেবল তথ্যের সমাহারই ইলম নয়, বরং ইলম হলো সেই নূর যা আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরে দান করেন। পবিত্র কোরআনেও জ্ঞানীদের কাছ থেকে জানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা নাহলের ৪৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যদি মানুষ কোনো বিষয়ে না জানে, তবে যেন তারা জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করে।
এছাড়া সুরা মায়েদার ১৫ ও ১৬ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা আলো ও স্পষ্ট কিতাব মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে এবং শান্তির পথ দেখায়। তবে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে যেন কেউ ফেতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বা ভুল ব্যাখ্যার সন্ধানে কোরআনের আয়াতগুলোর অপব্যাখ্যা না করে।
যারা জ্ঞানে পরিপক্ক, তারা কোরআনের জটিল বিষয়গুলো আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করেন এবং এর প্রতি অবিচল বিশ্বাস রাখেন। পরিশেষে, দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং সরল পথে অবিচল থাকা। সঠিক আলেম নির্বাচন, নিয়মিত অধ্যয়ন এবং আমলের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানই একজন মুসলমানকে দুনিয়া ও আখেরাতে সফল করতে পারে।
তাই জ্ঞান অর্জনের প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং যোগ্য ব্যক্তিদের অনুসরণ করা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য।
