ঢাকা শহরের কবরস্থান ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও সহজতর করার লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মৃত ব্যক্তির দাফন প্রক্রিয়া, কবরের অবস্থান শনাক্তকরণ এবং কবরস্থান সংক্রান্ত তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে এই ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করা হচ্ছে।
বর্তমানে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি পৃথকভাবে তাদের কবরস্থান ব্যবস্থাপনার জন্য অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ডিএনসিসির উদ্যোগে ‘গ্রেভইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট ডিএনসিসি’ অ্যাপের মাধ্যমে কবরস্থানের তালিকা, নিয়ম-কানুন দেখা এবং ঘরে বসেই দাফনের আবেদন করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কবরস্থান থেকে দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এবং পরবর্তীতে অনলাইনে সনদ প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ডিএসসিসিও তাদের আওতাধীন কবরস্থানগুলোর তথ্য ডিজিটাল ডেটাবেজে সংরক্ষণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আজিমপুর কবরস্থানে লেন নম্বর নির্ধারণ এবং প্রতিটি কবরের নম্বর যুক্ত করার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে স্বজনরা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কবরের অবস্থান শনাক্ত করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ডিএসসিসির সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জানান, আজিমপুর কবরস্থানে প্রায় ২৬ হাজার কবর রয়েছে, কিন্তু বর্তমানে কবরের সুনির্দিষ্ট নম্বর না থাকায় স্বজনরা অনেক সময় কবর শনাক্ত করতে হিমশিম খান। তাই সব কবরের ডেটাবেজ তৈরি এবং সিসি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অ্যাপের মাধ্যমে কবরস্থানে কতটি কবর ফাঁকা আছে, তা-ও নাগরিকরা জানতে পারবেন। ডিএনসিসির সমাজ কল্যাণ কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, তাদের অ্যাপটি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) তৈরি করেছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল থেকে সার্টিফিকেশনের প্রক্রিয়া চলছে। সার্টিফিকেশন সম্পন্ন হলে অ্যাপটি পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন নাগরিকরা।
তবে প্রযুক্তির এই উদ্যোগের সাফল্যের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গুগল প্লে স্টোরের তথ্য অনুযায়ী, ডিএনসিসির অ্যাপটির ডাউনলোড সংখ্যা এখনো এক হাজারের সামান্য বেশি, যা বিশাল জনসংখ্যার এই শহরে অত্যন্ত নগণ্য। এছাড়া ব্যবহারকারীদের একাংশ সেবা পেতে বিলম্ব হওয়ার অভিযোগ করেছেন। ডিজিটাল ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জ হলো মাঠপর্যায়ের তথ্যের সাথে ডেটাবেজের নিয়মিত সমন্বয়।
প্রতিদিন নতুন দাফন, কবরের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং কবর পুনর্ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ না করলে তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা কঠিন। এছাড়া কেবল অ্যাপ তৈরিই যথেষ্ট নয়, বরং এর প্রচার এবং নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (সিটি করপোরেশন-১) মো. রবিউল ইসলাম জানান, নতুন কবরস্থান নির্মাণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পরিকল্পনার ওপর নির্ভরশীল।
মেয়র ও সিটি করপোরেশন সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা দিলে সরকার প্রশাসনিক অনুমোদন প্রদান করবে। আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার মাওলানা হাফিজুর রহমান জানান, প্রতি বছর দাফনের সংখ্যা বাড়লেও কবরস্থানের জায়গা বাড়ছে না, ফলে সাধারণ কবরের নির্ধারিত পরিমাপ বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ছে। তিনি পুরান ঢাকার আশপাশে নতুন সরকারি কবরস্থানের জন্য জমি খোঁজার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ডিজিটাল সেবা পূর্ণাঙ্গ করতে হলে আবেদন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি দাফন ও সংরক্ষণ ফি অনলাইনে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক ব্যবস্থার সাথে এর সমন্বয় প্রয়োজন। সব মিলিয়ে, একটি স্মার্ট কবরস্থান ব্যবস্থাপনা কেবল অ্যাপের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং সঠিক ম্যাপিং, নিয়মিত ডেটা আপডেট, অনলাইন ফি প্রদান এবং ভূমি পরিকল্পনার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন মূল লক্ষ্য।
