প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন যে, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বহুমাত্রিক ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার ফলে দেশে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা তৈরি হয়েছিল।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, জ্বালানি ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় কাজ চলছে। এর মধ্যে ৩০টি কূপের খননকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস যুক্ত হয়েছে।
বর্তমানে আরও ৭টি কূপের খনন কাজ চলমান রয়েছে এবং এগুলো সম্পন্ন হলে গ্রিডে আরও ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো পর্যায়ক্রমে খননের জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে সরকার ৪,৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী ও সক্ষম করে তুলতে দুটি আধুনিক রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি জানান। এছাড়া অফশোর ও অনশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট বা পিএসসির আওতায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর আন্তর্জাতিক বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে এবং অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়াও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
সামুদ্রিক এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি ক্ষমতা আরও ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া পায়রা ও মোংলা বন্দর এলাকায় আরও এক থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। গত ৮ জুন ২০২৬ তারিখে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারিসহ সব প্রয়োজনীয় উপকরণের ওপর থেকে কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর এবং অতিরিক্ত অগ্রীম আয়করসহ সব ধরনের শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
রুফটপ সোলার প্যানেল স্থাপনকারীদের উৎসাহিত করতে সরকার একটি আর্থিক মডেল ঘোষণা করেছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে যারা বাসাবাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার স্থাপন করবেন, তাদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০. ১৫ টাকা দরে কিনে নেবে। বর্তমান উৎপাদন খরচের তুলনায় এই হার অনেক বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তারা ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত নিট মুনাফা অর্জনের সুযোগ পাবেন।
এই সুবিধা পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে সোলার প্যানেল বসাতে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরে বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সোলারের পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার জ্বালানি খাতের এই উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
