জীবন আসলে কী এবং সুখের প্রকৃত সংজ্ঞা কী—এই প্রশ্নটি মানব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন একটি জিজ্ঞাসা। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং বস্তুগত সম্পদের প্রাচুর্য বাড়লেও মানুষের জীবনে এই প্রশ্নের গভীরতা কমেনি। আধুনিক সমাজে জীবনকে প্রায়শই সাফল্যের মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। ভালো চাকরি, বড় বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংকে জমানো অর্থ এবং সামাজিক পদমর্যাদাকেই মানুষ জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে গণ্য করে।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই উপলব্ধি করেন যে, অর্জনের তালিকা দীর্ঘ হলেও জীবনের ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা রয়ে গেছে। মৃত্যু যখন সব অর্জনের হিসাব বন্ধ করে দেয়, তখন ব্যাংক ব্যালান্স বা পদবি কোনো কাজে আসে না; বরং মানুষের আচরণ, সম্পর্ক এবং রেখে যাওয়া স্মৃতিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
আধুনিক সমাজের বড় সংকট হলো, এখানে মানুষকে সফল হওয়ার উপায় শেখানো হলেও অর্থপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার শিক্ষা খুব কম দেওয়া হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের দীর্ঘমেয়াদী ভালো থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে উষ্ণ এবং বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক। অর্থাৎ জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে সম্পদের চেয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সময় এবং পারস্পরিক ভালোবাসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মানুষ শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ধাপে ভবিষ্যতের সুখের আশায় বর্তমানকে বিসর্জন দেয়। পরীক্ষায় ভালো ফল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরি বা পদোন্নতিকে সুখের একেকটি দরজা মনে করা হয়। কিন্তু একটি দরজা পার হওয়ার পর সামনে আরও নতুন দরজা এসে দাঁড়ায়। এই ‘পরবর্তীতে সুখে থাকব’—এই মানসিকতা আধুনিক মানুষের জীবনের একটি বড় ফাঁদ।
জাপানি সংস্কৃতিতে ‘ইকিগাই’ বা বেঁচে থাকার কারণ ধারণাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য বাঁচে না। জীবনের অর্থ একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। কারো কাছে এটি পরিবার, কারো কাছে জ্ঞানার্জন, আবার কারো কাছে মানবসেবা। অন্যের জীবনের সম্পাদিত সংস্করণের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করা সুখের জন্য ক্ষতিকর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত তার জীবনের সাফল্যের দিকগুলোই তুলে ধরে, কিন্তু আড়ালে থাকা একাকীত্ব, ঋণ বা ব্যক্তিগত লড়াইগুলো প্রকাশ পায় না। অন্যের জীবনের হাইলাইটের সঙ্গে নিজের জীবনের ব্যাকস্টেজ তুলনা করা ভুল। সুখ মানেই কেবল আনন্দ নয়, বরং জীবনের দুঃখ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও অর্থ খুঁজে পাওয়ার নামই জীবন।
অস্ট্রিয়ান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ভিক্টর ফ্রাঙ্কলের মতে, মানুষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও পরিস্থিতির প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা রাখে। আমাদের সমাজে সন্তানদের কেবল সফল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়, কিন্তু ভালো মানুষ হওয়া বা ব্যর্থতার সঙ্গে লড়াই করার শিক্ষা দেওয়া হয় না। জীবন মানে কেবল দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা নয়, বরং প্রাপ্ত সময়কে অর্থপূর্ণ করে তোলা।
অসুস্থ মানুষের সেবা করা, বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটানো বা অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মতো ছোট ছোট কাজই জীবনের প্রকৃত অর্থ তৈরি করে। অর্থনীতি বা প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য, কিন্তু মানুষ যেন এসবের দাস না হয়ে পড়ে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সাধারণত ক্যারিয়ারের সাফল্যের চেয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সময়ের অভাব নিয়ে বেশি আফসোস করে।
তাই জীবনকে কেবল বড় করার চেয়ে অর্থপূর্ণ করা জরুরি। শেষ পর্যন্ত আমরা কত বছর বেঁচে থাকলাম, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আমরা কতটা মানবিক হয়ে বেঁচে থাকতে পারলাম।
