বাংলাদেশে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা এবং ধলেশ্বরী নদীর তীরে প্রায় ৮.৩ লাখ হেক্টর চর এলাকা রয়েছে। গবেষক ড. মো. ফোরকান আলী বলেন, এর মধ্যে প্রায় ৫.২ থেকে ৭.৯ লাখ হেক্টর জমি চাষযোগ্য। এই চরাঞ্চলগুলোতে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ বসবাস করেন। তবে চরের জমিতে পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি জৈব পদার্থের ঘাটতি দেখা যায়।
ড. আলী বলেন, লবণাক্ততা মুক্ত চরাঞ্চলগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা, বাজশাহী, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুর এবং মাদারীপুর উল্লেখযোগ্য। সাধারণত বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর এই অঞ্চলের কৃষকেরা স্থানীয় জাতের ফসল চাষ করেন।
মূল ভূখণ্ডে চাষযোগ্য জমির স্বল্পতার কারণে দেশে মসলা ফসলের জমির পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ধনিয়া এবং কালিজিরা এই দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মসলাজাতীয় ফসল, তবে এসবের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ড. আলী জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে ক্রমবর্ধমান জনসখ্যার খাবারের চাহিদা মেটাতে প্রতিকূল চরের ইকোসিস্টেমে এই মসলা ফসলগুলোর ফলন এবং উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
টেকসই ফসল উৎপাদন এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চরাঞ্চলে উন্নত জাতের বীজ এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রয়োগ প্রয়োজন। ড. আলী বলেন, এই লক্ষ্যে একক ফসলসহ মিশ্র ফসলের চাষাবাদ আবশ্যক। তিনি জানান, সংযুক্ত চরাঞ্চলগুলো সাধারণত উঁচু হয় এবং সেখানে বালু ও আগাছার পরিমাণ বেশি থাকে, তবে পলির পরিমাণ কম থাকে।
এই ধরনের চরে মসলা ফসলের মধ্যে রসুন, পেঁয়াজ, মুড়িকাটা পেঁয়াজ এবং মরিচ একক বা মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়।
অন্যদিকে, দ্বীপ চরাঞ্চলগুলো নিচু হয় এবং সেখানে আগাছা কম থাকে তবে পলির পরিমাণ বেশি থাকে। এই ধরনের চরাঞ্চলে সাধারণত পেঁয়াজ একক ফসল হিসেবে অথবা পেঁয়াজের সাথে কালিজিরা ও ধনিয়ার মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। একই জমিতে একসঙ্গে দুই বা তার বেশি প্রজাতির ফসল চাষ করার পদ্ধতিকে মিশ্র ফসল চাষ বলা হয়।
ড. আলী জানান, ভূমি, শ্রম, পুষ্টি উপাদান, পানি এবং আলোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে মিশ্র ফসলের মাধ্যমে একক ফসলের তুলনায় মোট উৎপাদন, আয় এবং ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা যায়। এছাড়া এই পদ্ধতিতে রোগ ও পোকার আক্রমণ কম হয় এবং ফসল চাষের সফলতা বৃদ্ধি পায়।
বর্তমানে চরাঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা ১৪৫-১৬২ শতাংশ। পরিকল্পিত মিশ্র ফসল চাষের মাধ্যমে এই নিবিড়তা আরও বাড়ানো সম্ভব। একই জমিতে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস অনুসরণ করে দুই ধরনের ফসল চাষের পদ্ধতিকে আন্তঃফসল চাষ বলা হয়। চরে সারি কিংবা ফালি পদ্ধতিতে আন্তঃফসল চাষ করার সুযোগ রয়েছে। n
দ্বীপ চরাঞ্চলে সরাসরি বীজ বপনকৃত পেঁয়াজের সাথে কালিজিরা বা ধনিয়া অথবা উভয়টি একসাথে মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। পাওয়ার টিলার দিয়ে দুইবার চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করা হয়। শেষ চাষের সময় পচা গোবর সার, বিঘাপ্রতি ৩৫ কেজি টিএসপি, ২৫ কেজি এমওপি, এবং ২০ কেজি জিপসামের পাশাপাশি ২-৩ কেজি দস্তা সার এবং ১-২ কেজি বোরন সার প্রয়োগ করা হয়।
পেঁয়াজের জন্য বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪ এবং বারি পেঁয়াজ-৬ জাতগুলো চরে চাষের উপযোগী। তবে বারি পেঁয়াজ-৪ সবচেয়ে উন্নত জাত। কালিজিরা ও ধনিয়ার জন্য বারি কালিজিরা-১ এবং বারি ধনিয়া-২ উন্নত জাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে পেঁয়াজ, ধনিয়া এবং কালিজিরার বীজ একই সাথে বপন করা হয়।
পেঁয়াজের ভেতর ধনিয়া ও কালিজিরার বীজ হার অর্ধেক করে বপন করা হয়।
বীজ বপনের আগে পেঁয়াজ বীজ প্রতি কেজি ২ গ্রাম প্রোভ্যাক্স ছত্রাকনাশক দিয়ে শোধন করা হয়। ধনিয়া বীজ পানিতে ২৪-৪৮ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে পরে শুকিয়ে বপন করা হয়। কালিজিরা বীজ কমপক্ষে ২ দিন রোদে শুকিয়ে এবং ১০-১২ ঘণ্টা পানিতে ভেজাতে হয়। এরপর প্রতি কেজি বীজ ২ গ্রাম প্রোভ্যাক্স ছত্রাকনাশক দিয়ে শোধন করে বপন করা হয়।
বীজ বপনের ২০-২৫ দিন পর পানি সেচ দিয়ে বিঘাপ্রতি ১৫-২০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয়। বপনের ৪০-৪৫ দিন পর আগাছা পরিষ্কার করে পুনরায় ১৫-২০ কেজি ইউরিয়া সার দেওয়া হয়। এবং বপনের ৬০-৭০ দিন পর পুনরায় আগাছা নিড়িয়ে সেচ দিয়ে ১৫-২০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয়।
রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য লুনা সেন্সেশন, রোভরাল এবং এমিস্টার টপ পর্যায়ক্রমে ১৫ দিন পর পর স্প্রে করা হয়। থ্রিপস দমনের জন্য সাকসেস বা ইমিটাফ স্প্রে করা হয়।
মার্চ মাসের শেষ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পেঁয়াজ সংগ্রহ করা হয়। পেঁয়াজ সংগ্রহের ১৫-২০ দিন আগে ধনিয়া ও কালিজিরার বীজ সংগ্রহ করা হয়। তবে ধনিয়া পাতা বপনের ১.০-১. ৫ মাসের মধ্যে সংগ্রহ করা হয়। জাতভেদে পেঁয়াজের ফলন বিঘাপ্রতি ২.০-২. ০. ৫ টন হয়। কালিজিরার ফলন বিঘাপ্রতি ১২০-১৪০ কেজি এবং ধনিয়ার ফলন বিঘাপ্রতি ১৫০-২০০ কেজি বীজ এবং ৫০০-৭০০ কেজি কাঁচা পাতা হয়।
ড. আলী বলেন, প্রকৃতির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে মিশ্র ফসলের মাধ্যমে প্রতি একক জমি থেকে মোট উৎপাদন, আয় এবং ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
