চট্টগ্রামের রাউজানে মুহাম্মদ করিম (৩৬) নামে এক যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার ৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কেরানীহাট বাজারে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত মুহাম্মদ করিম ওই ইউনিয়নের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতে বাজারে প্রবেশের সময় ৪-৫টি মোটরসাইকেলে করে একদল অস্ত্রধারী তাকে ঘিরে ফেলে।
এ সময় হামলাকারীদের একজন কিরিচ দিয়ে করিমের ঘাড় ও মাথায় আঘাত করে। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে অন্যরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, করিমের পেটে, ঊরুতে ও নিতম্বে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বের হয়ে যায়। এছাড়া তার ঘাড় ও কপালে ধারালো অস্ত্রের গভীর আঘাত রয়েছে। ঘটনার পর কেরানীহাট বাজারের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক ঘণ্টা মরদেহ সড়কের ওপর পড়ে থাকার পর পুলিশ তা উদ্ধার করে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, এই বাজারে অতীতে এমন প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা পাওয়া যায়নি, যা তদন্তের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নিহত মুহাম্মদ করিম দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে প্রবাসজীবন কাটিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তিনি দেশে ফেরেন।
দেশে ফেরার পর তিনি বিএনপির বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে সক্রিয় ছিলেন। রাউজান উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আজম জানিয়েছেন, করিম যুবদল কর্মী হিসেবে পরিচিত হলেও সংগঠনের কোনো পদে ছিলেন না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দেশে ফেরার পর করিম মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এর আগে তিনি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন এবং পরে বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় প্রবাসে যান।
করিম পরিবার নিয়ে হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের আমান বাজার এলাকায় বসবাস করতেন। তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, করিমের বিরুদ্ধে চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তিনি একাধিকবার কারাগারেও ছিলেন। রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ বেলায়াত হোসেন জানান, সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের পর বাজার এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান পরিচালনা করছে। এর আগে গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী বাজারের চৌমুহনী এলাকায় অস্ত্রধারীদের গুলিতে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ নিহত হয়েছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে এলাকায় শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত অব্যাহত রেখেছে এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
