চট্টগ্রাম নগরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বাস্তবায়িত অন্তত ১১টি উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘ সময় ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এসব প্রকল্পে সরকারি ও বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় ১৪২ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও তা থেকে কোনো সুফল পাচ্ছেন না নগরবাসী। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বিপণিবিতান, খাদ্য পরীক্ষাগার, সেতু, মাল্টিলেভেল কার পার্কিং এবং বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত গাড়ি।
সিডিএ নিজস্ব তহবিল থেকে তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও বাকিগুলো সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়ন ও উপহারের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে। রাজাখালী খালে সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করা হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় চার বছর ধরে তা অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
বর্তমানে সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০১৭ সালে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সাততলা মাল্টিলেভেল কার পার্কিংটিও কার্যত ব্যবহারের বাইরে রয়েছে। এর নিচতলা ছাড়া বাকি অংশগুলো অব্যবহৃত। বিপণিবিতানগুলোর অবস্থাও একই রকম। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিডিএর সল্টগোলা শপিং কমপ্লেক্স ২০২২ সালে কাজ শেষ হওয়ার পর এখনো চালু হয়নি।
১৮৬টি দোকানের মধ্যে ৮২টি বিক্রি হলেও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। অন্যদিকে, ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নিউমার্কেট বি-ব্লক বিপণিবিতানটি ২০১৫ সালে শেষ হলেও এর ওপরের তলাগুলো বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পাহাড় থেকে পানি নামা রোধে প্রতিরোধ দেয়াল না থাকায় এসকেলেটর ও লিফট নষ্ট হয়ে গেছে এবং সেখানে ব্যবসার পরিবেশ নেই।
সিডিএ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সল্টগোলা শপিং কমপ্লেক্স আগামী অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে এবং নিউমার্কেট বি-ব্লকের সমস্যা সমাধানে দেয়াল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিবিরহাটে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগারটিও ১০ বছরে চালু করা সম্ভব হয়নি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত এই তিনতলা ভবনে ৮২টি আধুনিক সরঞ্জাম থাকলেও জনবল নিয়োগের অনুমোদন না থাকায় কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জনবল নিয়োগের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পরীক্ষাগারের জন্য জার্মানি থেকে পাওয়া প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের একটি গাড়িও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এছাড়া ধুলা পরিষ্কারের জন্য প্রায় ছয় কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা ছয়টি গাড়ি এবং ভারত সরকারের উপহার দেওয়া একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সও সেভাবে কাজে আসছে না।
একই সঙ্গে কচুরিপানা ও ভাসমান বর্জ্য পরিষ্কারের জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা আটটি উইড হারভেস্টারের মধ্যে একটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হলেও তা ব্যবহারের উপযোগী নয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ করে পরীক্ষাগার, যন্ত্রপাতি ও গাড়ি কেনার আগে এগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল ও নিয়মিত অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। যথাযথ পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জনগণের এই বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
