গোসল করার পর শরীর পরিষ্কার ও সতেজ থাকার কথা থাকলেও অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, গোসলের কিছুক্ষণ পরই শরীর থেকে আবার ঘামের মতো দুর্গন্ধ আসতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল অস্বস্তিকর নয়, বরং কর্মক্ষেত্র বা জনসমাগমস্থলে বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, শরীরের এই দুর্গন্ধের পেছনে কেবল ঘাম দায়ী নয়; বরং ত্বকের ব্যাকটেরিয়া, শরীরের আর্দ্রতা, পোশাকের ধরন, পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস এবং কিছু শারীরিক কারণও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সাধারণত ঘাম নিজে তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত নয়। ত্বকে প্রাকৃতিকভাবে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া যখন ঘামের বিভিন্ন উপাদান ভেঙে ফেলে, তখনই দুর্গন্ধ তৈরি হয়। বগল, কুঁচকি এবং শরীরের ভাঁজযুক্ত স্থানগুলোতে ঘাম বেশি জমে থাকে, ফলে এসব জায়গা থেকে গন্ধও তুলনামূলক বেশি অনুভূত হয়। গোসলের পর শরীরের এসব অংশে আর্দ্রতা রয়ে গেলে এবং পরবর্তীতে ঘাম হলে খুব দ্রুত দুর্গন্ধ ফিরে আসতে পারে।
গোসলের সময় শরীরের কিছু অংশ সঠিকভাবে পরিষ্কার না করা দুর্গন্ধের একটি বড় কারণ। অনেকে তাড়াহুড়ো করে গোসল করার সময় বগল, ঘাড়, কুঁচকি এবং পায়ের আঙুলের ফাঁকের মতো জায়গাগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করেন না। ফলে এসব স্থানে ঘাম, ত্বকের তেল এবং মৃত কোষ জমে থাকে। কেবল পানি দিয়ে শরীর ভিজিয়ে নেওয়া দুর্গন্ধ দূর করার জন্য যথেষ্ট নয়।
ঘাম বেশি হয় এমন জায়গাগুলো মৃদু ক্লিনজার বা সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া জরুরি। তবে দুর্গন্ধ দূর করার জন্য অতিরিক্ত শক্তিশালী বা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান বারবার ব্যবহার করা সবসময় কার্যকর নয়। অতিরিক্ত পরিষ্কার করার ফলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও সুরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা ত্বকে শুষ্কতা বা জ্বালাপোড়া তৈরি করে।
তাই ত্বকের ধরন অনুযায়ী মৃদু ক্লিনজার ব্যবহার করা শ্রেয়। এছাড়া গোসলের সময় ব্যবহৃত লুফা দীর্ঘ সময় ভেজা অবস্থায় ফেলে রাখলে তাতে জীবাণু ও মৃত ত্বকের অংশ জমতে পারে। তাই লুফা নিয়মিত পরিষ্কার ও সম্পূর্ণ শুকিয়ে রাখা প্রয়োজন। গোসল শেষে শরীর পুরোপুরি না শুকিয়ে পোশাক পরে ফেলার অভ্যাসও দুর্গন্ধের কারণ হতে পারে।
আর্দ্রতা আটকে থাকলে ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার সহজ হয়। বিশেষ করে বগল, কুঁচকি ও পায়ের আঙুলের মাঝের অংশ তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে মুছে সম্পূর্ণ শুকিয়ে নেওয়া জরুরি। শরীর মোছার তোয়ালেটিও নিয়মিত ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে ব্যবহার করতে হবে। অনেক সময় দুর্গন্ধের উৎস শরীর নয়, বরং পোশাক। ঘামে ভেজা টি-শার্ট, অন্তর্বাস, মোজা বা ব্যায়ামের পোশাক পুনরায় ব্যবহার করলে তাতে জমে থাকা ব্যাকটেরিয়ার কারণে পরিষ্কার শরীরেও দুর্গন্ধ অনুভূত হতে পারে।
তাই প্রতিদিন পরিষ্কার পোশাক পরা এবং ঘামে ভেজা পোশাক দীর্ঘ সময় পরে না থেকে ধুয়ে ভালোভাবে শুকিয়ে ব্যবহার করা উচিত। তোয়ালে, বিছানার চাদর ও শরীর মোছার কাপড়ও নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ডিওডোরেন্ট বা অ্যান্টিপার্সপিরেন্ট সাময়িকভাবে দুর্গন্ধ কমাতে বা ঘাম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এগুলো দুর্গন্ধের মূল কারণ সবসময় দূর করতে পারে না।
তাই কেবল সুগন্ধি বা ডিওডোরেন্টের ওপর নির্ভর না করে শরীর পরিষ্কার রাখা, ভালোভাবে শুকানো এবং পরিষ্কার পোশাক পরার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো পণ্য ব্যবহারের পর ত্বকে জ্বালা, চুলকানি বা র্যাশ দেখা দিলে তা ব্যবহার বন্ধ করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস বজায় রাখার পরও যদি দীর্ঘদিন শরীরের দুর্গন্ধ থেকে যায়, গন্ধের ধরন হঠাৎ বদলে যায় কিংবা অস্বাভাবিকভাবে বেশি ঘাম হতে থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কিছু ত্বকের সমস্যা, অতিরিক্ত ঘাম বা অন্যান্য শারীরিক অবস্থার সঙ্গে শরীরের গন্ধের পরিবর্তন সম্পর্কিত হতে পারে। তাই গোসলের পরও দুর্গন্ধ হলে বারবার সাবান বা সুগন্ধি ব্যবহার না করে আগে কারণটি খুঁজে বের করা এবং সঠিক অভ্যাস গড়ে তোলাই শরীরকে দীর্ঘ সময় সতেজ রাখার মূল উপায়।
