গাইবান্ধায় একটি জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন সংক্রান্ত এফিডেভিটে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতির অভিযোগে বাবা ও ছেলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার পূর্বপাড়া মহেশপুর গ্রামের বাসিন্দা মানিকুল্ল্যার ছেলে সাকোয়াত হোসেন এবং তার ছেলে আসাদুজ্জামান। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ এর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাব্বির আহম্মেদের স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতির ঘটনায় এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধা সদর আমলি আদালতে এই মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার বাদী এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী নাজমুল হুদা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলার নথি ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ আগস্ট সকালে অভিযুক্ত সাকোয়াত হোসেন ও তার ছেলে আসাদুজ্জামান গাইবান্ধা সদর আমলি আদালতের এজলাসে উপস্থিত হন।
তারা জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের উদ্দেশ্যে একটি এফিডেভিট করার জন্য কিছু কাগজপত্র বেঞ্চ সহকারীর কাছে জমা দেন। বেঞ্চ সহকারী কাগজপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করার সময় লক্ষ্য করেন যে, একই বিষয়ে তারা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক সম্পাদিত আরও একটি এফিডেভিটের ফটোকপি দাখিল করেছেন। পরবর্তীতে আসাদুজ্জামান সাকোয়াত হোসেনের একই ব্যক্তি মর্মে সম্পাদিত এফিডেভিটের মূল কপিটি উপস্থাপন করেন।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী কাগজগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান যে, ওই এফিডেভিটে ব্যবহৃত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির আহম্মেদের স্বাক্ষর ও সিলটি আসল নয়। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এফিডেভিটটিতে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ গাইবান্ধার সিল ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে কর্মরত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির আহম্মেদ গত ১৫ জুলাইয়ের আগে পলাশবাড়ী উপজেলার এফিডেভিট সম্পাদনের দায়িত্বে ছিলেন না।
কিন্তু অভিযুক্তদের দাখিল করা এফিডেভিটটিতে ১৬ জুন তারিখের স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে। এছাড়া এফিডেভিটটিতে ২০২৬ সালের ১৬ জুনের ৬২৩/২৬ নম্বর স্মারক উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আদালতের প্রকৃত রেজিস্টার যাচাই করে দেখা যায়, ওই তারিখে রেজিস্টারে ৬২৩/২৬ নম্বর স্মারকটি এন্ট্রিই হয়নি। রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, ৫ মে তারিখে সর্বশেষ ৪৫০/২৬ নম্বর স্মারকটি এন্ট্রি করা হয়েছিল।
এর ফলে এফিডেভিটটি যে জাল ও সৃজিত করা হয়েছে, তা প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। এজাহারে আরও বলা হয়েছে, এফিডেভিটে ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দের সিলটিও ভুয়া। কারণ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ এ এফিডেভিট সম্পাদনের ক্ষেত্রে যে সিল ব্যবহার করা হয়, তা বাংলা ভাষায় লেখা থাকে। অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণামূলকভাবে ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর জাল করেছেন এবং আদালতের সিলমোহর জালিয়াতির মাধ্যমে একটি মিথ্যা ও জাল এফিডেভিট প্রস্তুত করেছেন।
পরবর্তীতে এই জাল এফিডেভিটকে প্রকৃত ও বৈধ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রায়ই আদালতের নাম ও ভুয়া সিল ব্যবহার করে এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সাকোয়াত হোসেন ও তার ছেলে আসাদুজ্জামানসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং আইন অনুযায়ী তাদের বিচার হবে। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে আদালতের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র তৈরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন বলে জানা গেছে।
