দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে তার জনমুখী কার্যক্রম এবং সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধের বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে অন্যতম হলো রাতের বেলা ছদ্মবেশে জনগণের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। এক রাতে খলিফা ওমর (রা. ) তার গোলাম আসলামকে নিয়ে মদিনার উপকণ্ঠে পাথুরে ভূমির দিকে যান।
সেখানে তিনি একটি আগুনের কুণ্ডলী দেখতে পান এবং মানুষের উপস্থিতি আঁচ করতে পেরে সেখানে উপস্থিত হন। সেখানে গিয়ে তিনি এক নারীকে দেখতে পান, যার পাশে কয়েকটি শিশু কাঁদছিল। খলিফা ওমর (রা. ) ওই নারীকে তাদের কষ্টের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান যে, প্রচণ্ড শীত এবং ক্ষুধার কারণে শিশুরা কাঁদছে।
ওই নারী আরও জানান যে, পাতিলের ভেতর কেবল পানি গরম করা হচ্ছে যাতে শিশুরা মনে করে খাবার রান্না হচ্ছে এবং একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তিনি আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে বলেন যে, খলিফা ওমর (রা. ) তাদের এই অবস্থার কথা জানেন না। এই কথা শুনে খলিফা ওমর (রা.
) তাৎক্ষণিকভাবে খেলাফতের খাদ্যগুদামে যান এবং এক বস্তা আটা ও এক পাত্র ঘি সংগ্রহ করেন। গোলাম আসলাম নিজে বোঝা বহন করতে চাইলেও খলিফা ওমর (রা. ) তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজের পিঠে বস্তাটি তুলে নেন। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন তার বোঝা অন্য কেউ বহন করবে না।
এরপর তিনি ওই নারীর কুটিরে গিয়ে নিজেই রান্না করেন এবং শিশুদের খাইয়ে দেন। রান্না করার সময় আগুনের ধোঁয়ায় তার দাড়িতে কালি লেগে যায়। শিশুদের খাইয়ে দেওয়ার পর তিনি ওই নারীর প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ফিরে আসেন। এই পুরো সময় ওই নারী জানতেন না যে, তিনি খলিফার সাথে কথা বলছেন।
খলিফা ওমরের দায়িত্ববোধের আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় জাকাতের উট খোঁজার ঘটনায়। একদিন হযরত আলী (রা. ) খলিফাকে তাড়াহুড়ো করে কোথাও যেতে দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করেন। খলিফা জানান যে, জাকাতের একটি উট পালিয়ে গেছে এবং তিনি সেটি খুঁজছেন। তখন হযরত আলী (রা. ) মন্তব্য করেন যে, খলিফার এই কঠোর পরিশ্রম পরবর্তী খলিফাদের জন্য দায়িত্ব পালন কঠিন করে তুলছে।
অর্থাৎ, খলিফা যেভাবে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি বিষয়ের তদারকি করছেন, তা অনুসরণ করা অন্যদের জন্য কষ্টসাধ্য হতে পারে। এছাড়া মদিনায় খাদ্যের সংকটের সময়ও খলিফা ওমরের জনদরদী মনোভাব প্রকাশ পায়। সে সময় তিনি রুটি ও ঘি খাচ্ছিলেন, এমন সময় মরুভূমি থেকে আসা এক ব্যক্তি তার সাথে দেখা করতে আসেন।
খলিফা তাকে খাবার খেতে দিলে ওই ব্যক্তি ঘি দেখে অবাক হন এবং জানান যে, অনেকদিন তিনি ঘি খাননি। এই কথা শুনে খলিফা ওমর (রা. ) প্রতিজ্ঞা করেন যে, যতদিন সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা স্বাভাবিক না হয়, ততদিন তিনি নিজে ঘি খাবেন না। এসব ঘটনা ঐতিহাসিক গ্রন্থ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া এবং মুয়াত্তায়ে মালেকে বর্ণিত হয়েছে।
খলিফা ওমরের এই জীবনধারা ও শাসনপদ্ধতি তৎকালীন সময়ে জনগণের কল্যাণে তার নিবেদিতপ্রাণ থাকার প্রমাণ বহন করে। তিনি সবসময় সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগের প্রতি সজাগ ছিলেন এবং নিজের আরাম-আয়েশের চেয়ে জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতেন। তার এই শাসনব্যবস্থা ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
