কুষ্টিয়ার তরুণ আলোকচিত্রী জহির উদ্দিন আনন্দ ওয়েডিং ফটোগ্রাফারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত জাতীয় বিবাহ আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে গ্র্যান্ড উইনার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ‘ফরএভার স্টোরি: চ্যাপ্টার ১’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীতে দেশের ৩০টিরও বেশি জেলা থেকে তিন হাজারের বেশি ছবি ও ভিডিও জমা পড়েছিল। কঠোর বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাছাইকৃত ১৪০টি ছবির মধ্য থেকে আনন্দের তোলা একটি ছবি শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পায়।
একই আয়োজনে তিনি ‘ব্রাইড সিঙ্গেল পোর্ট্রেট’ ক্যাটাগরিতেও প্রথম স্থান অর্জন করেন। জহির উদ্দিন আনন্দ কুষ্টিয়ার বাসিন্দা এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। ফটোগ্রাফির প্রতি ছোটবেলা থেকেই তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার ছলে ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেন তিনি।
শুরুতে নিজস্ব ক্যামেরা না থাকলেও বন্ধুর ক্যামেরা ধার নিয়ে তিনি ছবি তোলা শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবিগুলো প্রকাশের পর তিনি অপ্রত্যাশিত সাড়া পান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি নিজের চেষ্টায় আলো, কম্পোজিশন এবং ক্যামেরার সেটিংস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। ফটোগ্রাফিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার পথে তাকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
পরিবারের সমর্থন পেতেও শুরুতে কিছুটা সময় লেগেছে। তবে নিজের কাজের মাধ্যমে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জনের পর তিনি পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০১৮ সালে ডব্লিউপিপিবি আয়োজিত প্রতিযোগিতায় ‘গ্রুম সিঙ্গেল’ ক্যাটাগরিতে প্রথম রানারআপ হওয়ার মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন। ২০১৯ সালে একই প্ল্যাটফর্মে তিনি তিনটি পুরস্কার অর্জন করেন।
এরপর ২০২৫ সালে সনি আলফা কানেক্ট ডে প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হওয়ার সাফল্যও তার ঝুলিতে যুক্ত হয়। গ্র্যান্ড উইনার অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী ছবিটির পেছনের গল্পটি বেশ ঘটনাবহুল। কক্সবাজারে একটি বিয়ের শুটিংয়ের সময় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে কাজের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়। প্রতিকূল আবহাওয়াকে বাধা না মেনে আনন্দ বৃষ্টির মধ্যেই শুটিং চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তার টিমের সদস্যরাও এই কাজে সহযোগিতা করেন। বৃষ্টির মধ্যে তোলা সেই ফ্রেমটিই পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পায়। শুটিংয়ের সময় তার একটি ফ্ল্যাশ নষ্ট হয়ে গেলেও তিনি সেই ক্ষতিকে বড় করে দেখেননি। তার মতে, এমন একটি ছবি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। বর্তমানে আনন্দ কুষ্টিয়াতে ‘ক্যাপচার মোমেন্টেস’ নামক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ করছেন।
ওয়েডিং ফটোগ্রাফিকে তিনি মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে স্মৃতিতে ধরে রাখার শিল্প হিসেবে দেখেন। তার মতে, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হাসিকান্না ও আবেগের মিশেলে এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয় যা আর ফিরে আসে না। সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করাই তার মূল লক্ষ্য। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময়ের চর্চা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছেন।
তার এই অর্জন কেবল একটি পুরস্কার নয়, বরং দীর্ঘদিনের স্বপ্নের পথচলার স্বীকৃতি। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সঠিক আগ্রহ ও পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতার মধ্যেও সাফল্য অর্জন সম্ভব। এই জাতীয় স্বীকৃতি তার ক্যারিয়ারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বলে তিনি মনে করেন। তার এই যাত্রা এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
