জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর ফাঁকির অভিযোগে জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এখন থেকে কোনো করদাতার আয় প্রাক্কলন বা অনুমানের ভিত্তিতে কর ফাঁকির অভিযোগে জরিমানা করা যাবে না। জরিমানা আরোপের জন্য করদাতার আয়, সম্পদ, দায় বা ব্যয় গোপন কিংবা অসত্যভাবে প্রদর্শনের সপক্ষে গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের সই করা এক আদেশে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৭২-এর প্রয়োগ সংক্রান্ত এই আদেশে বলা হয়েছে, জরিমানা আরোপের আগে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে অবশ্যই শুনানি গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। করদাতার বক্তব্য শোনার যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দেওয়া ছাড়া কোনোভাবেই জরিমানা আরোপ করা যাবে না।
আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, উপ-কর কমিশনারকে প্রথমে ধারা ২৭২ অনুযায়ী জরিমানা আরোপের যৌক্তিকতা আছে কি না, তা যাচাই করে একটি সুনির্দিষ্ট করাদেশ দিতে হবে। যদি কর ফাঁকির বিষয়টি দালিলিক প্রমাণসহ প্রমাণিত হয়, তবেই জরিমানা আরোপ করা যাবে। অন্যথায়, শুধুমাত্র আয় প্রাক্কলন করে জরিমানা করার সুযোগ নেই।
এনবিআরের এই নতুন আদেশে চাকরি, ভাড়া, কৃষি, ব্যবসা বা পেশা, মূলধনী আয় এবং আর্থিক পরিসম্পদ থেকে আয়ের ক্ষেত্রে ধারা ২৭২-এর প্রয়োগের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, যদি কোনো করদাতা আয় গোপন না করে বরং কোনো করযোগ্য আয়কে ভুলবশত করমুক্ত হিসেবে প্রদর্শন করেন, তবে সেই কারণে ধারা ২৭২ অনুযায়ী জরিমানা করা যাবে না।
এছাড়া, আইন অনুযায়ী কোনো করমুক্ত আয় যদি করযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে সেই ক্ষেত্রেও এই ধারার আওতায় জরিমানা আরোপ করা সম্ভব নয়। ভাড়ার মাধ্যমে আয়ের ক্ষেত্রেও এনবিআর একই নীতি অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। শুধুমাত্র যৌক্তিক ভাড়ামূল্য প্রাক্কলন করে কর ফাঁকির অভিযোগ আনা যাবে না। একইভাবে, অন্যান্য উৎস থেকে আয়ের ক্ষেত্রেও দালিলিক প্রমাণ ছাড়া জরিমানা করা যাবে না।
আয়কর আইনের ধারা ৬৬-এ উল্লিখিত অন্যান্য উৎস থেকে আয়ের ক্ষেত্রে যদি কোনো খাত গোপন বা অসত্য পরিমাণে প্রদর্শনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবেই জরিমানা করা যাবে। তবে আয়কর আইনের ৬৭ ধারার উপধারা (৩) ছাড়া অন্য কোনো উপধারা প্রয়োগের কারণে যদি অন্যান্য উৎস থেকে আয় উদ্ভূত হয়, তবে সেই আয়ের ওপর ধারা ২৭২ অনুযায়ী জরিমানা আরোপের সুযোগ নেই।
শুধুমাত্র ৬৭ ধারার উপধারা (৩) প্রয়োগের কারণে উদ্ভূত আয়ের ক্ষেত্রে জরিমানা আরোপ করা যাবে, তবে সেখানেও দালিলিক প্রমাণের বাধ্যবাধকতা বজায় থাকবে। এনবিআরের এই আদেশের মূল লক্ষ্য হলো কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং করদাতাদের হয়রানি কমানো। কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা রোধে এবং কর আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে এই নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এখন থেকে কর কর্মকর্তাদের যেকোনো জরিমানা আরোপের সিদ্ধান্তে সুনির্দিষ্ট দালিলিক ভিত্তি থাকতে হবে, যা কর আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। করদাতাদের অধিকার রক্ষা এবং কর প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। করদাতাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় এই বিষয়গুলো মাথায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের এই নতুন নির্দেশনার ফলে কর ফাঁকির অভিযোগে জরিমানা আরোপের প্রক্রিয়া আরও সুশৃঙ্খল হবে এবং করদাতারা তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন।
